সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী

সেদিন তিতিলকে জিজ্ঞাসা করলাম, “পৃথিবীর চাঁদ ক”টি?”

 

ও আমার প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকোতে শুরু করে দিল। পাশেই বসেছিল ছোট বোন তিন্নি। দিদিকে মাথা চুলকোতে দেখে ও ফিক্‌ করে হেসে বললো, “এমা এটা জানিস না? পৃথিবীর চাঁদ তো একটা।” তিন্নির উত্তরটা ঠিক, আবার বেঠিকও বলা যায়। ঊর্ধ্বাকাশে পাঠানো মানুষের তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে ধরলে পৃথিবীর চাঁদের সংখ্যা এখন অনেক।

 

মহাকাশে যে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি রয়েছে তার কিছু লাগে গবেষণার কাজে, আর বাকিগুলি লাগে মানুষের নানা কাজে। পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, অনুসন্ধান প্রভৃতি নানা কাজে এদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 

মহাকাশে গিয়েও শান্তি নেই। শত্রুর দল ওঁত পেতে আছে সেখানেও। মাঝে মধ্যেই ওদের হাঙ্গামায় বেসামাল হয়ে পড়ে এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলি আর তখনই শুরু হয় গন্ডগোল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে সে এক লন্ডভন্ড কান্ড ঘটে।

 

আমাদের পৃথিবী ঘিরে আছে একটি চৌম্বকক্ষেত্র। এই চৌম্বকক্ষেত্র একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষেত্রের মধ্যে আবদ্ধ আছে যাকে বলা হয় চৌম্বকমণ্ডল (Magnetosphere)। এই চৌম্বকমণ্ডল আবার একটি সদা-পরিবর্তনশীল অঞ্চলের দ্বারা আবদ্ধ। এই অঞ্চলকে বলা হয় ম্যাগনিটোপজ (Magnetopause)।

 

পৃথিবীর চৌম্বক-মেরু ও ভৌগলিক-মেরু এক নয়। চৌম্বক-মেরুরেখা ও ভৌগলিক-মেরুরেখা ছেদবিন্দুতে ১১·৫ ডিগ্রি কোণ উৎপন্ন করে। পৃথিবীর চৌম্বক-উত্তরমেরু ও দক্ষিণমেরু একই ব্যাসের দু”টি বিপরীত বিন্দু নয়। এছাড়াও এই মেরু দুটি সময়ের সাথে সাথে স্থান পরিবর্তন করে। দেখা গেছে, পৃথিবীর চৌম্বক-উত্তরমেরু প্রায় ১৭ ডিগ্রি ব্যাসার্ধের একটি বৃত্তে ভৌগলিক-উত্তরমেরুর চারপাশে প্রায় ৯৬০ বৎসরে একবার প্রদক্ষিণ করে।

 

ভূ-বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস যে, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল লোহা-নিকেল সমবায়ে গঠিত। পৃথিবীর এই স্তরকে বলা হয় “নিফে” (Nife) স্তর। কোনো কারণে এই নিফে স্তর যদি আবর্তিত হতে থাকে এবং পৃথিবীর মেরুরেখার সঙ্গে যদি কোনো সমান্তরাল চৌম্বকক্ষেত্র থাকে তবে পৃথিবীর নিরক্ষরেখার সঙ্গে সমান্তরাল বৃত্তাকার পথে বিদ্যুৎ স্রোত প্রবাহিত হতে থাকবে।

 

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন আদিমকাল থেকে পৃথিবীর উপাদানে খুব অল্প পরিমাণ চৌম্বকত্ব ছিল। আকস্মিক তাপের উদ্ভবে অথবা ওই ধরনের কোনো কারণে ওই ক্ষীণ চৌম্বকত্ব ধ্বংস হয়ে পৃথিবীর নিরক্ষরেখা অঞ্চলে চৌম্বক বল-রেখা সঞ্চালিত হয়ে বিদ্যুৎ-প্রবাহের সৃষ্টি করে। আবার অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন এই বিদ্যুৎ-স্রোত তাপ-তড়িৎ ক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত। সূর্যের তাপ পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে পড়ে না। ফলে ভূ-পৃষ্ঠের উপর তাপের পরিমাণ সর্বত্র সমান থাকে না। এরফলে তাপ-বৈষম্যের সৃষ্টি হয়, যা তাপ-তড়িৎ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। কেউ কেউ মনে করেন, ভৌগলিক-মেরু এবং চৌম্বক-মেরু খুব কাছাকাছি হওয়ায় পৃথিবীর আহ্নিকগতির সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের একটা সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। এই প্রসঙ্গে ১৯১৮ সালের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ওই সময় পৃথিবীর আবর্তন গতির হঠাৎ-ই পরিবর্তন হয়। সেই সময় দেখা যায় পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রেরও পরিবর্তন ঘটেছে।

 

 

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে সূর্য থেকে নিঃসৃত তড়িতাবিষ্ট কণার সমবায়ে গঠিত সৌরবায়ু বা সৌরঝড়। এই সৌরবায়ুর প্রবাহে চৌম্বকমণ্ডল অস্থির হয়ে ওঠে। পৃথিবীর কাছাকাছি সৌরবায়ুর বেগ সেকেন্ডে ৪০০ কিলোমিটারের মতো হতে দেখা যায়। এই বায়ু সূর্য থেকে কখনো একটানা আসে আবার কখনো ঝলকে ঝলকে আসে।

 

পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে দু’টি তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বলয়। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্ব যথাক্রমে ৩২০০ কিলোমিটার ও ১৬০০০ কিলোমিটার। এছাড়াও প্রায় ১০০,০০০ কিলোমিটার দূরে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ও অন্তর্গ্রহ মহাকাশ অঞ্চলের সীমান্ত বরাবর আরও একটি বলয় আছে। এই বলয়গুলির মধ্যে প্রথমটি প্রোটন কণিকার দ্বারা গঠিত, যার শক্তির পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের মতো। এর প্রান্তভাগ কখনো কখনো পৃথিবীর ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে নেমে আসে। আর দ্বিতীয় বলয়টি প্রধানত ইলেকট্রন কণিকার দ্বারা গঠিত, যার শক্তির পরিমাণ প্রায় এক মিলিয়ন (দশ লক্ষ) ইলেকট্রন ভোল্ট। পৃথিবী ঘিরে ওঠা তেজষ্ক্রিয় বলয়গুলির কণিকার উৎস সূর্য। সূর্য থেকে বেরিয়ে এসে এগুলি পৃথিবীর চুম্বকরশ্মির বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। সৌরকলঙ্কের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়া কমার সাথে এই সৌরকণিকা-স্রোতের পরিমাণ বাড়ে কমে।

 

 

বিজ্ঞানীদের মতে সৌরঝড়ের সময় সূর্যের আবহমণ্ডল থেকে চৌম্বক শক্তি হঠাৎ করে ছিটকে বেরিয়ে আসে। সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসে অগুন্তি তড়িতাহিত সৌরকণা। শক্তিশালী কণাগুলি এক্স-রশ্মি এবং সৌরঝড়ে তৈরি হওয়া চৌম্বকক্ষেত্র তীব্র গতিতে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। পৃথিবীতে দেখা ঝড়গুলির তুলনায় এই ঝড় কয়েক লক্ষগুণ শক্তিশালী। তবে এই ঝড়ের আঘাতে প্রাণহানির আশঙ্কা তেমন থাকে না। পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডল বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার এই ঝড়ের আঘাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে।

 

তবে সূর্য থেকে ধেয়ে আসা এই ঝড় যে পৃথিবীতে কোনো বিপর্যয় ঘটায় না তা নয়। তড়িতাহিত সৌরকণা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের অনেক ভিতরে ঢুকে পড়লে তা আর বের হতে পারে না। এই কণাগুলি তখন দু’টি মেরুর মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। এর ফলে সৃষ্টি হয় মেরুজ্যোতি। প্রধানত পৃথিবীর দুই মেরুর কাছাকাছি জায়গায় এই জ্যোতি দেখতে পাওয়া যায়।

 

আয়নোস্ফিয়ারে যেসব প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হল মেরুজ্যোতি। ১৯৩৮ সালের জানুয়ারি মাসে অত্যন্ত উজ্জ্বল মেরুজ্যোতি দেখা গিয়েছিল। এই মেরুজ্যোতি এতটাই উজ্জ্বল ছিলযে ক্রিমিয়া এবং আফ্রিকা থেকেও এদের দেখা গিয়েছিল। এই সময় সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তীব্র চৌম্বক ঝটিকার আবির্ভাব ঘটেছিল।

 

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের আকষ্মিক পরিবর্তন ঘটলে অনেক সময় কম্পাস সঠিক দিক নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়। এই ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় “চৌম্বক-ঝটিকা”।

 

চৌম্বক-ঝটিকার প্রভাবে ধাতব জিনিস, বিশেষত ধাতব তারের উপরে তড়িৎ প্রবাহের উদ্ভব হয়। এই তড়িৎ প্রবাহ এলোমেলো ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ইত্যাদি মারফৎ বার্তা প্রেরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

 

চৌম্বক-ঝটিকার সঙ্গে আয়নোস্ফিয়ারে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সৌরকণিকার আঘাতে আয়নোস্ফিয়ার অত্যন্ত গরম হয়ে ওঠে, ফলে এলোমেলো গতিসম্পন্ন আয়নিত মেঘের সৃষ্টি হয়।

 

পৃথিবীর চারপাশে যে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি ঘুরছে সেগুলি পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের বাইরে থাকে। তাই এদের উপর সৌরঝড়ের আঘাতটা খুব বেশি আসে। সময়ের আগেই কোনো কোনো উপগ্রহ ভেঙে পড়ে পৃথিবীর বুকে। ১৯৭৯ সালে এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৭৩ সালে উৎক্ষেপণ করা “স্কাইল্যাব”-এর নিজের কক্ষপথে থাকার কথা ছিল ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু সৌরঝড়ের আঘাতে উপগ্রহটি সময়ের আগে ১৯৭৯ সালে ভেঙে পড়ে ভারত মহাসাগরে এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়।

***********

তথ্য সূত্রঃ

১) মহাকাশের বুকে পৃথিবী, শঙ্কর চক্রবর্তী, বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।

২) জ্ঞান ও বিজ্ঞান ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪

৩) আয়নোস্ফিয়ারেরকথা, এফ· আই· চেস্তনভ্‌, অনুবাদঃ রবীন্দ্র মজুমদার, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি (প্রাইভেট) লিমিটেড, কলকাতা।

৪) মহাকাশের কথা, শঙ্কর চক্রবর্তী, বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।

৫) Encyclopaedia Britanica, 15th Edition.

 

ক্রেডিটঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

Abu Hasan Rumi
আমি আবু হাসান রুমি এবং আমি একজন টপ রেটেড এডমিন সাপোরটার এবং একজন ডিজিটাল মার্কেটার যে প্রতিনিয়তই তার কাজের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টায় আছে। আমার সকল চিন্তা-ভাবনা এবং আগ্রহকে সকলের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এ ব্লগটি চালু করা।
Posts created 11

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top