পানির বোতলের কারুকার্যের নেপথ্যকাহিনি

কৃষ্ণনগরে কাকুর বাড়িতে পৌঁছতে বেলা প্রায় দশটা বাজল। গুড ফ্রাইডের ছুটি থাকায় কাকু , কাকিমা ছাড়াও খুড়তুতো দাদা পিকলু, গোপাবউদি ও ভাইঝি টুম্পা বাড়িতেই ছিল। পিকলুদা শিক্ষক, গোপাবউদি অধ্যাপিকা আর টুম্পা ছাত্রী। ছুটির দিন ছাড়া এই সময় ওরা কেউই বাড়িতে থাকে না।

 

কাল ফোন করে আগাম জানিয়েছিলাম, তাই আয়োজনের খামতি ছিল না। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পরই হাত-মুখ ধুয়ে যেতে হল ডাইনিং হলে। বসল জম্পেশ প্রাতরাশের আসর। খাওয়ার সাথে চলল আড্ডা। কিছুক্ষণ সাদামাটা পারিবারিক কথাবার্তা চলার পরই হঠাৎ আলোচনা তীক্ষ্ণ বাঁক নিল টুম্পার একটা অদ্ভুত প্রশ্নের হাত ধরে। ব্যাপারটা বরং খুলেই বলি।

 

শেয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠার আগে একটা প্যাকেজড্ ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের বোতল কিনেছিলাম। পুরো জল শেষ না হওয়ায় বোতলটা ফেলা হয় নি। ডাইনিং টেবিলের একপ্রান্তে সেটা শোভা পাচ্ছিল। বোতলটা দেখিয়ে টুম্পা প্রশ্ন করল, “জল ফুরোলেই তো ওটা বাতিল হবে। তাহলে বোতলটার গায়ে এত নকশার বাহার কেন?”

 

পিকলুদা পনির পকোড়া চিবোতে চিবোতে বলল, “এটাও জানিস না ! দেখতে সুন্দর লাগবে বলেই গা-টায় কারুকার্য করা হয়েছে।”

 

গোপাবউদি পিকলুদার কথায় ঘোরতর সন্দেহ ব্যক্ত করল। ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ জিনিসকে দৃষ্টিনন্দন বানানো তো ভস্মে ঘি ঢালারই সামিল! গোপাবউদির ধারণা, সৌন্দর্যবৃদ্ধি নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই আছে অন্য কারণ।

 

ছেলে-বউমার বিতন্ডায় কাকিমা নিরপেক্ষ অবস্থান নিল। ঝানু কূটনীতিকদের স্টাইলে বলল, “দেখতে যে ভালো লাগছে সেটা ঠিক। তবে শুধু দেখার জন্যই এত কিছু করা হয়েছে বলে তো মনে হয় না।”

 

কাকু কিছু বললেন না। শুধু মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, প্রকৃত কারণটা মোটেই ওঁর অজানা নয় ।

 

আমি কাকুকে প্রস্তাব দিলাম , “আসল কারণটা তুমিই খোলসা করে জানিয়ে দাও না!”

 

প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে কাকু বললেন,”টেকনিক্যাল টার্ম বাদ দিয়ে বোঝানোর এলেম আমার একদমই নেই। সবাই ভিরমি খাবে মোমেন্ট অফ্‌ ইনার্শিয়া, রেডিয়াস অফ্‌ জ্যাইরেশন,নিউট্রাল অ্যাক্সিস্‌ এসব শুনলে! সহজ করে বরং তুই-ই বলে দে।”

 

অগত্যা আমাকে মাঠে নামতেই হল। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বললাম, “টেকনিক্যাল কচকচি বাদ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করব আমরা। শুরু করব একটা প্রশ্ন দিয়ে। আচ্ছা,প্যাতপেতে জিনিসকে পোক্ত বানানোর কি কোনো সহজ রাস্তা আছে?”

 

সবাই নিরুত্তর।

 

আমি আবার ভাষণ শুরু করলাম, “স্রেফ আকার পাল্টেই এটা করা সম্ভব। এর অনেক নজির ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইস্পাতের পাতলা চাদর এত নমনীয় যে মাদুরের মতো গোল করে গুটিয়ে রাখা সম্ভব। অথচ সেই চাদর দিয়ে বানানো করোগেটেড শিট্‌ বা চলতি কথায় টিনের শিট্‌ এত মজবুত যে টিনের চালের ওপর গিয়ে চড়ে বসলেও তা দুমড়োয় না।”

 

এবার একটা মোক্ষম প্রশ্ন করল টুম্পা। জানতে চাইল, মূল উপাদান এক থাকা সত্ত্বেও আকারের সাথে মজবুতির এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে কারণটা কী।

 

“খুবই বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন,” আমি টুম্পার প্রশ্নের তারিফ করে বললাম, “বক্রন বা বেন্ডিং ঠেকাতে সাদামাটা চেহারার তুলনায় ঢেউতোলা কিংবা খাঁজওলা আকার অনেক বেশি উপযুক্ত। মোদ্দা কথা হল,বস্তুর উপাদান এক জায়গায় না রেখে ছড়িয়ে দিতে পারলে বস্তুর বক্রন-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। টাটার ‘সুমো’ বা মাহিন্দ্রার ‘বোলেরো’ গাড়ির ছাদে লম্বালম্বি খাঁজ রাখা থাকে এই কারণেই। ভারী মালপত্র বইবার মতো পোক্ত করার জন্যই ইঞ্জিনিয়াররা বানিয়েছেন খাঁজযুক্ত ছাদ। সমতল ছাদ হলে ভয় থাকত মালের ভারে তুবড়ে যাবার।”

 

গোপাবউদি মন্তব্য করল,”এখন বুঝতে পারছি বড়ো সাইজের হাতা-খুন্তির হাতল লম্বার দিকে সাদামাটা হলেও আড়াআড়ি দিকে সমতল না হয়ে কেন কিছুটা গোল আকৃতির হয়।”

 

টুম্পা বলল, “কাকুমণি, আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি। জল ফুরোলেই ফেলে দেওয়া হবে বলে জলের বোতলের দেওয়াল মোটা বানিয়ে দাম বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। খাঁজটাজগুলো দেওয়া হয় পাতলা ন্যাতপেতে বোতলকে পোক্ত বানানোর জন্যই। ওগুলো না রাখলে সামান্য চাপেই বোতল দুমড়ে গিয়ে অসুবিধে ঘটাত।”

 

আমি হেসে বললাম, “কথাটা একশো শতাংশ ঠিক।”

 

হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই কাকিমা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “এগারোটা তো বাজতে চলল! বউমা, এখুনি রান্নাঘরে চলো। অনেক কাজ পড়ে আছে।”

 

অত:পর আমাদের জমাটি আড্ডার আসর ভঙ্গ হল।

 

ক্রেডিটঃ সুজিতকুমার নাহা

Abu Hasan Rumi
আমি আবু হাসান রুমি এবং আমি একজন টপ রেটেড এডমিন সাপোরটার এবং একজন ডিজিটাল মার্কেটার যে প্রতিনিয়তই তার কাজের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টায় আছে। আমার সকল চিন্তা-ভাবনা এবং আগ্রহকে সকলের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এ ব্লগটি চালু করা।
Posts created 13

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top