ছদ্মবেশী ফল

সুজিত ও আমার দিন ভালোই কাটছে। খরচাপাতি এখানে বেশি হলেও দু’জন একসাথে থাকি বলে সাশ্রয় হয় অনেকটাই, আছে যানজটের সমস্যা। তবে অফিস আমাদের আস্তানার কাছে হওয়ার দরুন যাতায়াতে কোনো অসুবিধে হয় না। ছুটির দিনগুলোও পরমানন্দে কাটে দর্জিলদার সাথে আড্ডা দিয়ে আর ঘুরে বেড়িয়ে।

 

নিরামিষ পদ বানানোর ব্যাপারে আমরা একস্‌পেরিমেন্ট চালাই মাঝেসাঝে। ডাল, আলুভাজা, ঘুগনি এসব সহজ রান্না রপ্ত করার পর মনে হল, এবার কিঞ্চিৎ জটিল কেস হাতে নেওয়া যেতে পারে। পটল, ঝিঙে, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো,বিন, কুমড়ো এসব দিয়ে মিক্সড ভেজিটেবলের তরকারি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল এক শনিবার। লুচির অবাঙালি সংস্করণ ‘পুরি’ দোকান থেকে কিনে নিলেই চলবে। সবজিগুলো জোগাড় করে মিশ্র সবজির পদ কীভাবে রান্না করা যায় তা নিয়ে যখন গভীর গবেষণা চলছে, তখনই হাজির হল দর্জিলদা। সবজিগুলোকে একঝলক দেখে গম্ভীর হয়ে বলল, “আজ তাহলে ফলাহার করাই ঠিক হয়েছে। তা বেশ! ফল খাওয়া খুবই ভালো অভ্যেস।”

 

আমি ও সুজিত মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। সবজিকে কেন ফল বলে ভুল করছে দর্জিলদা! মাথা-টাথা হঠাৎ খারাপ হল নাকি?

 

আমাদের মনোভাব বুঝতে চৌকশ দর্জিলদার দেরি হল না। বলল, “ভাবছিস ভুল বকছি! ও কে, বিচার করে দেখা যাক কে ঠিক আর কে বেঠিক। সুজিত, অভিধানটা বার কর।”

 

কবিতা লেখার অভ্যাস থাকায় সুজিতের কাছে যে হরবখত থাকে চলন্তিকা আর সমার্থশব্দকোষ, সেটা জানত দর্জিলদা। ড্রয়ার থেকে চলন্তিকা বের করে দর্জিলদাকে দিল সুজিত। অভিধান ঘেঁটে দু’টি পৃষ্ঠা চিহ্নিত করে ওটা আমার হাতে দিয়ে দর্জিলদা বলল, “ফল আর সবজির ফারাক কী তা নিজের চোখেই দেখে নে।”

 

চিহ্নিত স্থানে চোখ বুলিয়ে যা জানা গেল তা এইরকম :
ফল – বৃক্ষলতাদির শস্য বা বীজাধার ,
সবজি – শাক, আনাজ,তরকারি

 

আমি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষে বলেই ফেললাম, “সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে! পুজো-আচ্চায় লাগে, অসুখ হলে বেশি করে খেতে হয়, স্বাদে মোটামুটিভাবে মিষ্টি, রান্না না করে সরাসরি খাওয়া চলে এমন জিনিসকে ফল আর শাকপাতা, আনাজপাতি যা লাগে নিরামিষ তরকারি বানাতে তাকেই সবজি বলে জানতাম। এখন তো মনে হচ্ছে সবজিদের দলে ছদ্মবেশী ফলের ভিড়ই বেশি!”

 

আমার অকপট স্বীকারোক্তিতে দর্জিলদা বেজায় খুশি হয়ে বলল,“কথাটা কিন্তু বেড়ে বলেছিস! আসলে রন্ধন-সম্পর্কিত বিবেচনায় যেগুলো সবজি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত,সেগুলোর বেশির ভাগই উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে নির্ভেজাল ফল বই আর কিছু নয় ! স্রেফ মজা করার জন্যই ঝিঙে পটল এসব দিয়ে বানানো খাবারকে ‘ফলাহার’ বলে তোদের ভড়কে দিয়েছিলাম। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও বটানির বিচারে পটল, ঝিঙে, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো,বিন, কুমড়ো গোছের জিনিসকে মোটেই সবজি বলা চলে না , কেননা সবই গাছের ফল।”

 

“সবজিরূপী ফলের ব্যাপারটা দারুণ গোলমেলে ঠেকছে! বিজ্ঞানমতে কোন্‌টা সবজি আর কোন্‌টা ফল সেটা চটজলদি বুঝব কীভাবে দর্জিলদা ?” জানতে চাইল সুজিত।

 

“ঠিক আছে,বলছি,” দর্জিলদা ব্যাখ্যান শুরু করল,“উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিচারে ফল ও সবজির ফারাক দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। সহজ কথায়, বীজের থাকা বা না থাকার ওপরেই ফলত্ব বা সবজিত্ব নির্ভর করে। ব্যাপারটা খোলসা করে বলি। সপুষ্পক উদ্ভিদের বীজ ধারণকারী অংশকেই ফল বলা হয়। এই মাপকাঠিতে বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো, কুমড়ো এসবকে ফল বলে মানতেই হবে। কেননা এদের ভেতর বীজ আছে যা থেকে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে চারা বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের গাছ উৎপন্ন করা যায়। এখানে বলে রাখি, জেনেটিক কারিকুরি করে বীজহীন আঙুর বা কমলার মতো সিডলেস ফ্রুট সৃষ্টি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বীজ না থাকলেও এগুলোকে কিন্তু ফল বলেই গণ্য করতে হবে।

 

এবার আসা যাক সবজির কথায়। ফল বাদে গাছের এডিবল অর্থাৎ ভক্ষণীয় অন্য অংশই সবজি। সেই এডিবল পার্টটা পাতা,শেকড়,কাণ্ড এমনকী ফুল বা কুঁড়িও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলি,পালং বা লেটুস হচ্ছে গাছের পাতা, মুলো বা গাজর হচ্ছে গাছের মূল আর ফুলকপি কিংবা ব্রকোলি হচ্ছে গাছের কুঁড়ি। ডাঁটাশাক, পুঁই এসবের পাতা ও কাণ্ড দুই-ই খাওয়া যায়। ভক্ষ্য ফুলের দৃষ্টান্ত এই মুহূর্তে যা মনে আসছে তা হচ্ছে সজনেফুল আর বকফুল।”

 

আমি এবার দর্জিলদার দিকে একটা কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়লাম, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু বীজযুক্ত কাঁচালঙ্কা, সজনেডাঁটা বা মটরশুটিকে ফলপট্টিতে না রেখে কেন সবজিবাজারে রাখা হয়,সেটা তো মাথায় ঢুকছে না।”

 

সহজেই গোলমেলে প্রশ্নটার মোকাবিলা করল দর্জিলদা। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে চটজলদি উত্তর দিল,“সাধারণ জনগণ বটানি জানে না। তাই স্বাদ আর ব্যবহারের ধরণ বিচার করেই আমজনতা উদ্ভিজ্জ জিনিসে ফল কিংবা সবজির লেবেল সেঁটেছে। সেইমত ওগুলোর ঠাঁই হয়েছে ফলপট্টি অথবা সবজিবাজারে।!”

 

“জ্ঞানলাভ তো অনেক হল, এখন দরকার এনার্জি লাভের। বেজায় খিদে পেয়েছে। চলো বাইরে থেকে কিছু খেয়ে আসি।” প্রস্তাব দিল সুজিত। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হতে বিলম্ব হল না। অত:পর আমাদের জ্ঞানগর্ভ আড্ডার আসর সমাপ্ত হল।

 

ক্রেডিটঃ জুনায়েদ আহমেদ সজিব

Abu Hasan Rumi
আমি আবু হাসান রুমি এবং আমি একজন টপ রেটেড এডমিন সাপোরটার এবং একজন ডিজিটাল মার্কেটার যে প্রতিনিয়তই তার কাজের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টায় আছে। আমার সকল চিন্তা-ভাবনা এবং আগ্রহকে সকলের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এ ব্লগটি চালু করা।
Posts created 10

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top