রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি

অনেকদিন ব্লগে কিছু লিখি না। বলতে গেলে সময় পাই না, অথবা টপিক খুজে পাই না। তবে আজ একটু ভিন্ন ধাঁচের টপিক নিয়ে লিখতে বসলাম।

রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি, নামটা এমনই। কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল না? এটা কিসের নাম? হ্যা, আমি বলছিলাম ২০১৮ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হওয়া লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ বইয়ের কথা। সচরাচর বইয়ের এমন নাম দেখা যায় না। আর এ নামটাই বইয়ের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, কোনো বইয়ের প্রথম ৩০ পাতা পাঠককেই কষ্ট করে পড়তে হবে, আর বাকি অংশটুকু পাঠককে পড়ানোর দায়িত্ব লেখকের। এই বইয়ের ক্ষেত্রে পাঠকের দায়িত্বটা একটু বেশি। কথায় বলে, সবুরে মেওয়া ফলে।  ২৬৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ে প্রথম ১০০ পৃষ্ঠা একটু কষ্ট করে পড়তে পারলেই সেই মেওয়া আপনি পেতে শুরু করবেন। এই থ্রিলার বইয়ের ক্ষেত্রে মেওয়া হলো টুইস্ট আর ক্লাইমেক্স। কি থেকে কি হবে তা বুঝে ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য। শেষের ৮০ পৃষ্ঠা বইটাকে নিয়ে গেছে এক অন্য লেভেলে।

বইপোকারা হয়তো জানেন যে কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে শেষ অংশটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমি সেই পরিচিত বাক্য ‘শেষ ভালো যার সব ভালো’র কথা বলছি। মাঝে মাঝে শেষের মুগ্ধতার গভীরতা এতোটাই হয় যে, পাঠকরা প্রথমদিককার রুক্ষতাকে ভুলে শেষের গভীরতায় ডুবে যায়। আমি আবার অতোটা বড় পাঠক নই, তাই কোনো বইয়ে ডুব দেয়ার আগে পায়ে দড়ি বেধে নামি। ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেলে দড়ি ধরে উপরে উঠে আসি।

এই থ্রিলার উপন্যাসটা শুরু হয় খুবই সামান্য ভাবে। শহরের অদূরে নির্জনে এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় নামের রেস্টুরেন্ট আছে, রেস্টুরেন্টের রান্না অসাধারণ হয়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সে রেস্টুরেন্টে খেতে আসে। কিন্তু এ রেস্টুরেন্টের চেয়েও বেশী রহস্যময়ী তার মালকিন মুসকান জুবেরি। এই মুসকান জুবেরিকে দিয়েই সব রহস্যের শুরু হয়, আবার এই মুসকান জুবেরিকে দিয়েই শেষ। সাথে আছে রহস্যের মায়াজালে আটকে পরা ডিবি অফিসার নূরে ছফা।

তারপর? নাহ, স্পয়লার দিবো না। তারপরেরটা বইয়ের পাতায় তোলা থাক।

এই বইয়েরই ২০১৯ বইমেলায় একটা সিকুয়েল এসেছে। সিকুয়েলের নাম ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও আসেননি’। খুব শীঘ্রই এটাও পড়ার ইচ্ছা আছে।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা বই এবারই প্রথম পড়লাম। একজন থ্রিলার পাঠক হিসাবে মোটেও খারাপ লাগেনি। উনার লেখা সবগুলো বই’ই ধীরে ধীরে পড়ার ইচ্ছা আছে। এ বইয়ের পিডিএফ ভার্সনটা আমি পড়েছি, তাই হার্ডকপি আমার কাছে নেই। অর্থাৎ, কভারের ছবিটা কালেক্টেড। যারা হার্ডকপি কিনতে চান, রকমারিতেই পেয়ে যাবেন। আর পিডিএফের জন্য গুগল করলেই হবে।

সব শেষে রবীন্দ্রনাথ খেতে আসুক আর নাই আসুক, সবুর করে প্রথম দিকটা পড়তে পারলে মেওয়া আপনি পাবেনই। তার গ্যারান্টি অবশ্যই রইলো।

রঙ সমাচার: রঙ দেখা এবং তার রহস্য

আমাদের আশেপাশের রঙিন প্রকৃতি যদি রঙিন না হতো? সব কিছুই দেখতে একই রকমের হত? অথবা হঠাৎ করেই নীলচে আকাশটা সবুজ আর গাছের সবুজ পাতা আকাশের নীল রঙে ভরে যেত? এসবের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে বিজ্ঞানের বইয়ে এসব কি বলে রেগে যাবেন না। নিজেকে এমন অবস্থায় কল্পনা করুন আর ভাবুন, তখন আপনার কাছে কেমন লাগবে? তখন কি হবে আপনার ভালোবাসার লাল গোলাপের? কি-ই বা হবে সেই নীল উদার আকাশের? এতো মহা ঝামেলা। সেই মনোমুগ্ধকর লাল গোলাপ তার সকল আবেদন হারিয়ে ফেলবে। গাছের পাতায় সে নতুন রঙ দেখাবে বেমানান, যা আর আগের মত চোখ জুড়াবে না। অর্থাৎ, এই সামান্য রঙ বা বর্ণ পরিবর্তনের কারনে ঘটে যাবে অনেক কিছুই। সঠিক জিনিসের সঠিক রঙ হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। তাইতো, সৃষ্টিকর্তা এই প্রকৃতিকে যে রঙে মানাবে; সে রঙেই সৃষ্টি করেছেন। যেকোনো রঙ দেখার ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বর্পূন ভূমিকা পালন করে আমাদের চোখ এবং মস্তিষ্ক।

এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, আমাদের মস্তিষ্কে রঙের অনুভূতি সৃষ্টি হয় কিভাবে?

যেকোনো ধরনের রঙ দেখা এবং পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের চোখ এবং মস্তিষ্ক একসাথে কাজ করে থাকে। আমাদের চোখে তো আর রঙ প্রবেশ করে না, করে আলো। চোখে আলো প্রবেশ করার পর সেই আলোকে ভিন্ন ভিন্ন রঙে কনভার্ট করার কাজটা চোখ আর মস্তিষ্ক একজোট হয়ে করে। চোখের ভেতরের একধরনের আলোক সংবেদী কোষ স্নায়ু ব্যবহার করে আমাদের মস্তিষ্কে বার্তা প্রেরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে কোষগুলোকে ডাকঘর আর স্নায়ুগুলোকে ডাকপিয়নের সাথে তুলনা করা যায়। প্রশ্ন করতে পারেন, কেন ডাকপিয়ন আর ডাকঘরের সাথে তুলনা করব। আলোক সংবেদী কোষ থেকে স্নায়ু গুলো আমাদের মস্তিষ্কে কিছু দেখার বার্তা প্রেরণ করলে আমাদের মস্তিষ্কে তখন দেখার অনুভূতি জাগে। ঠিক তেমনই ডাকপিয়ন যেমন আমাদের কাছে চিঠি নিয়ে আসলে চিঠি পাবার পর আমাদের বিভিন্ন ধরণের অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

আমাদের চোখের গড়ন সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি জানি। যারা জানেন না বা ভুলে গেছেন তারা সামান্য গুগল সার্চ করেই দেখে নিতে পারেন অথবা ক্লাস ৮-৯ এর বইয়েও পাবেন। আমাদের চোখের রেটিনাতে মিলিয়ন মিলিয়ন আলোক সংবেদী কোষ রয়েছে। এর কিছু কোষ হচ্ছে রড কোষ, আবার কিছু কোষ হচ্ছে কোণ কোষ। রড কোষ সংখ্যায় ১২০ মিলিয়নের কাছাকাছি আর কোণ কোষ ৬-৭ মিলিয়ন। এই আলোক সংবেদী স্নায়ুমুখগুলো আমাদের মস্তিস্কে স্নায়ু উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। তারপর এই উদ্দীপনা অপটিক নার্ভ বা দর্শন স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কর্টেক্সে পাঠানো হয়। আর এভাবেই গাছের পাতার সবুজ রঙ ও বিশাল আকাশের নীল রঙ আমাদের মস্তিষ্কে পোঁছায় এবং আমরা রঙের অনুভূতি পাই।

প্রথম রঙ নিয়ে গবেষনা শুরু

আমরা সকলেই বিজ্ঞানী নিউটনের কথা জানি। অনেকেই নিউটনের সম্পর্কে বেশি না জানলেও তার মাথায় আপেল পড়ার ঘটনাটা ঠিকই জানেন। এই আপেল পড়ার মাধ্যমেই তো শুরু হয় তার আবিষ্কার যাত্রা! তারপর বিভিন্ন আবিষ্কারের মাধ্যমে পুরো দুনিয়ায় জনপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি। তার আবিষ্কারের কথা বলতে গেলে আরো অনেক কিছুই বলে ফেলতে হবে। আর এখানে জীবনী পড়তে তো নিশ্চয়ই আসেননি। তার চাইতে আপনারা তার উইকিপিডিয়া পেজটাই দেখে নিতে পারেন। তার উইকিপিডিয়া পেজ ভিজিট করার জন্য এখানে ক্লিক করুন

A drawing of Sir Isaac Newton dispersing light with a glass prism
A drawing of Sir Isaac Newton dispersing light with a glass prism

এতো আবিষ্কারের পরও মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের জন্যই তাঁর নাম সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত হয়। মজার ব্যাপার হল, আমরা অনেকেই এখনো জানি না, রঙ নিয়ে প্রথম গবেষণা কিন্তু তিনিই করেছিলেন। গবেষণাটা তিনি মূলত করেছিলেন আলো নিয়ে, কিন্তু এর মধ্যে উঠে আসে রঙের কিছু মহা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই গবেষণার মাধ্যমেই তিনি প্রমান করেন যে, রঙ কোন বস্তুর নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট্য নয়, আবার এটা আলাদা কোনো বস্তু নয়। এটা কি করে সম্ভব? তাহলে আমরা যে যত রকমের রঙ দেখি, সেগুলো কি?

কোন বস্তুর পৃষ্ঠ বা তলের উপর কোন মাধ্যম থেকে আলো পড়লে বস্তুটি আলোক রশ্মির সবটুকুই শোষণ করে ফেলে। যেসব আলোক রশ্মি শোষণ করে থাকে, সেসব রশ্মি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় এবং আমাদের দৃষ্টিতে আর ধরা পরে না। যদি কোন একটি নির্দিষ্ট রশ্মি শোষণ করতে না পারে, তবে বস্তু সেই রশ্মিটিকে প্রতিফলিত করে দেয়। আর এই প্রতিফলিত রশ্মিটাই হয় বস্তুর রঙ।

উপরের ব্যাখ্যা থেকে বলা যায়, সবুজ রঙের কোন বস্তু ঠিক সবুজ নয়। বস্তুটির পৃষ্ঠে বা তলে যখন আলো আপতিত হয়, তখন বস্তুটির পৃষ্ঠটি সবুজ ছাড়া অন্যান্য সকল রঙ শোষণ করে ফেলে। তারপর সবুজ রঙকে প্রতিফলিত করে দেয়। মূলত আমরা এই প্রতিফলিত আলো দেখেই ভাবি যে বস্তুটি সবুজ রঙের। অর্থাৎ, বলতে পারেন আমরা অনেক সহজ সরল এবং সব সময়ই ধোঁকা খাচ্ছি। কেননা, বস্তুটিতো আর সবুজ রঙের নয়, বস্তুটি শুধুমাত্র সবুজ রঙকে শোষণ করতে পারছেনা আর তাই তাকে প্রতিফলিত করে দিচ্ছে। আমরা তখনই তাকে সবুজ রঙের ভেবে বসি। কতটা বোকা আমরা! তাই না?

আলো এবং রঙের খেলাঃ

একসময় রঙকে শুধুমাত্র বস্তুকে চিহ্নিত করবার মাধ্যম হিসাবেই গণ্য করা হত। কিন্তু মূলত বস্তুই একটি দৃশ্যমান উপাদান যার সাহায্যে রঙকে চিহ্নিত করা যায়। প্রাচীনকালে রঙকে অলঙ্ককরণের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হত। রঙের সাহায্যে ঔজ্জ্বল্যতা পাওয়া যায় কিন্তু রঙ আকৃতির সৌন্দর্যময়তার একটি অংশ মাত্র। আধুনিক কালের চিত্রকর্মে রঙকেই আকৃতির মূলধার বলা হয়। রঙ শুধু অলঙ্করণেই ব্যবহার হয় না, মূলত রঙই রয়েছে অস্বিত্বের মূলে।

আমাদের নিউটন সাহেব পরীক্ষা করে দেখিয়ে ছিলেন যে সূর্যের আলো বর্ণ-বিভাগহীন মনে হলেও তা মূলত সাতটি রশ্মির বা বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত। যে বস্তুতে সবগুলো রঙের প্রতিক্ষেপ ঘটে তা সাদা দেখায়, আবার যে বস্তু সবগুলো রঙ একসঙ্গে শোষণ করে তা কালো দেখায়। বস্তু আলো শোষণ করার ফলে আলোর অভাব ঘটে, আর অভাব ঘটলে তাকে অন্ধকার বলা হয়। তাই কালোই হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্ধকার।

স্বচ্ছ বস্তুর মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মি গমনকালে এর গতি বিবর্তিত হয়, কিন্তু যে বস্তু আংশিকভাবে স্বচ্ছ, সে বস্তুর ক্ষেত্রে কিছু রশ্মি তার মধ্যে শোষিত হয় এবং কিছু রশ্মি বিক্ষিপ্ত হয়। কোন কঠিন বস্তুই পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় অথবা পুরোপুরি অস্বচ্ছও নয়। তাই সকল বস্তুতেই আলোর কিছুটা শোষণ এবং কিছুটা প্রতিবিক্ষণ ঘটে। তাছাড়া বাতাস কখনই পুরোপুরি পরিস্কার নয়। তাই বাতাস ভেদ করে যে সূর্যকিরণ নামতে থাকে, তার স্পর্শে বস্তুপুঞ্জ বিচিত্র আকৃতি ধারণ করে। তাই সকল বস্তুর মধ্যেই রঙের খেলা বিদ্যমান।

আলোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে রঙের সব রকমের কর্মকান্ড। আর তাইতো আলো পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথেই রঙেরও পরিবর্তন ঘটে। এর জ্বল-জ্যান্ত প্রমান আমরা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময়ই পেয়ে থাকি। তাছাড়া কোন বস্তুকে এদিক-ওদিক নাড়লেও রঙের পরিবর্তন হয়।

পাশের বৃত্তে যে কয়টি রঙ চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোকে ঘনত্ব ও ঔজ্জ্বলের তারতম্যের ক্রম অনুসারে প্রত্যেকটিকে আরও ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়। এর ফলে মোট ৭২ টা রঙ পাওয়া যাবে। এভাবে অগ্রসর হতে থাকলে আরও রং নির্ণয় করা সম্ভব। বৃত্তে একটি রঙের অবিকল বিপরীতে যে রঙটি আছে তারা পরস্পর একে অন্যের অনুপূরক। লাল হচ্ছে সবুজের অনুপূরক। নীল হচ্ছে কমলার, বেগুনী হচ্ছে হলুদের ইত্যাদি। আলো যেমন অন্ধকারের বিপরীতে ধরা পরে অথবা উষ্ণতা শীতলতার, তেমনি অনুপুরক রঙ একে অন্যের বিপরীতে ধরা পরে। কিন্তু দুটো অনুপূরক রঙ যখন মিশ্রিত করা হয়, তখন তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে ধূসর বা কালো হয়ে যায়। তিনটি মৌলিক রঙ এর যে কোন দুটির মিশ্রণে যে রঙ তৈরী হবে, তা হবে তৃতীয় রঙটির অনুপূরক। যেমন হলুদ ও নীলের সংমিশ্রনের তৈরী সবুজ হচ্ছে লাল রং-এর অনুপুরক।

একই সমতলে থাকলেও কোনও রঙ মনে হয় সামনে এগিয়ে আসছে এবং কোন রঙ পিছিয়ে যাচ্ছে। এর কারন দৃষ্টিতে বিভিন্ন রঙ এর আনুপাতিক অপসৃয়মানতা আছে। আপনারা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, লাল রঙের একটি স্বতঃসম্মুখবর্তিতা আছে। আপনি ক্যানভাসের যেখানেই এ রঙ ব্যবহার করুন না কেন, মনে হবে সেখানে অন্য সব রঙ ব্যবহার করা যায়। আমাদের দৃষ্টিগত অনুভূতিতে রঙের অপসৃয়মানতার যে স্বভাব ধরা পড়ছে তা ব্যবহার করেই শিল্পীরা বস্তুর ঘনত্ব এবং পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

রঙের যত ধরণ এবং বাহারঃ

আমরা সকলেই জানি রঙ দু’ধরণের – মৌলিক রঙ ও যৌগিক রঙ। লাল, সবুজ ও নীল – এ তিনটি রঙকেই আমরা মৌলিক রঙ হিসাবে চিনি। অনেকেই হয়ত জানেন যে এই মৌলিক রঙ গুলোকে সংক্ষেপে “আসল” বলা হয়। অর্থাৎ, আ – আসমানী (নীল), স – সবুজ, ল – লাল।

একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কি? আমি কিন্তু মৌলিক রঙে হলুদের কথা উল্লেখ্যই করিনি। ভাবছেন আমি সবুজ কোথায় থেকে পেলাম, তাই তো? না, আমি ঠিকই আছি। আমাদের মস্তিষ্কের জন্য মৌলিক রঙ লাল, সবুজ, নীল। আপনি যখন চিত্রশিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন, তখন মৌলিক রঙ হিসেবে লাল, হলুদ এবং নীলকে পাবেন। তখন সবুজ একটি যৌগিক রঙ। তবে স্ট্যান্ডার্ড রঙের বিচার করলে, তাতে লাল, নীল, সবুজকেই মৌলিক রঙ হিসেবে ধরা হয়।

এই লাল, নীল, সবুজ রঙকে সমান অনুপাতে মিশানোর মাধ্যমে আমরা সাদা রঙ পেতে পারি। আবার এই তিনটি রঙকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশানোর মাধ্যমেই আমরা আলোক বর্ণালীর সবকয়টি রঙই পেতে পারি। যেহেতু কয়েকটি রঙকে মিশিয়ে এই নতুন রঙগুলো প্রস্তুত করা হয়, সেহেতু এগুলো হচ্ছে যৌগিক রঙ।

চলুন রঙ নিয়ে আরেকটু ঘাঁটাঘাঁটি করি। আপনি কি আদৌ জানেন, মোট রঙ কয়টি? না জানলেও সমস্যা নেই। আপনার রঙের বক্স খুললে হয়তো ৬টি, ১২টি অথবা ২৪টি রঙ দেখতে পাবেন। কিন্তু আসলে এই পৃথিবীতে মোট কয়টি রঙ আছে? মনে করুন, কোন বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা হলো। সে লাল, নীল, কমলা, হলুদ সহ আরও কয়েকটি রঙের নাম বলতে পারবে। এবার আপনাকে যদি জিজ্ঞেসা করা হয়, আপনি আরো কয়েকটি রঙের নাম – যেমন বেগুণী, ফিরোজা, বাদামী বলতে পারবেন। কিন্তু আপনি কি জানেন যে আমাদের চোখই প্রায় ১০ মিলিয়ন রঙকে পৃথকভাবে সনাক্ত করতে পারে? হ্যাঁ, এই ১০ মিলিয়নের মধ্যে আমরা শুধুমাত্র অল্প কিছু রঙের নামই জানি। কিন্তু এতে আমাদের দোষই বা কি। বিজ্ঞানীরাও তো কিছু সংখ্যক রঙেরই নামকরন করতে পেরেছেন। এতসব রঙের নাম দেওয়া তো আর যা তা কথা নয়। তাই বিজ্ঞানীরা সব গুলো রঙকে আলাদা ভাবে প্রকাশ করার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা প্রত্যেকটি রঙকে পৃথক করার জন্য তাদেরকে সংখ্যায় এবং কোডের মাধ্যমে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন। কিছু রঙের কোড আপনি এখান থেকেই দেখে নিতে পারেনঃ https://htmlcolorcodes.com। এখানে সব গুলো রঙের কোড নেই, তবে যা আছে তাও একজন মানুষের পক্ষে মনে রাখা সম্ভব বলে মনে হয় না।

রঙের আরো ভেরিয়েশনের জন্য বিজ্ঞানীরা কয়েকটি কালার মডেল প্রবর্তন করেছেন। কেননা শুধুমাত্র লাল, সবুজ, নীল রঙ দিয়ে একটা নির্দিষ্ট রেঞ্জের বা সীমার রঙ তৈরি করা সম্ভব। বর্তমান প্রযুক্তি যেমন কম্পিউটার, টেলিভিশন, প্রিন্টার ইত্যাদি ব্যবহার করার জন্য আরো অনেক বেশি রঙের ভেরিয়েশনের প্রয়োজন হয়। তাই RGB (লাল, সবুজ, নীল) কালার মডেলের রঙগুলোকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে আরও প্রচুর রঙ তৈরি করা হয়। বিশেষ করে আমরা যে প্রিন্টার ব্যবহার করে ছবি প্রিন্ট করি, সেই প্রিন্টার এই কালার মডেল ব্যবহার করে প্রিন্ট করে থাকে। যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন ফটো এডিটিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেছেন তারা এই ভেরিয়েশন সম্পর্কে জেনে থাকবেন।

এতক্ষণ তো অনেক কিছুই বকবক করলাম। এখন বলুন তো, সাদা এবং কালো রঙকে কি আসলে রঙ হিসেবে বিবেচনা করা হয়?

আসলে পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সাদা এবং কালো বলতে কোন রঙই নেই। সাদা হচ্ছে সকল রঙের সমষ্টি আর কালো হচ্ছে সকল রঙের অনুপস্থিতি।

কাল্পনিক গল্পঃ প্যারালাল ইউনিভার্স

প্রায় প্রতিদিনই অফিস ছুটির পর সন্ধায় অফিস থেকে হেটে হেটে বাসায় যাই। অফিস থেকে বাসা প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার। হেটে যেতে ৪৫ মিনিট লাগে। এই সময়টায় মাথায় বিভিন্ন ধরনের চিন্তা খেলা করে- দেশ, বিদেশ, ইহজগৎ, পরজগত, ভুত, ভবিষ্যত ইত্যাদি ইত্যাদি। একই সাথে শরীর আর ব্রেইন দুটোরই এক্সারসাইস হয়ে যায়।

সেদিনই এমন হেটে হেটে যাচ্ছি, যখন একটা বাস ষ্টপের কাছে আসলাম দেখলাম সেখানে বেশ কিছু মানুষের জটলা। হঠাৎ একটা বাসের হর্নে আমার চিন্তায় ছেঁদ পরল। আমার কেমন একটা অদ্ভুত ফিল হতে লাগল। মনে হতে লাগল এখানে কিছু একটা হবে। কিন্তু কি হবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। মাথার ভিতর ওলোট পালট চিন্তা বয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে, অনুভুতি টা নিয়ে ভাবছি। ঠিক তখনই মনে হল এখানে একটা এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছে। ফুটপাতে মানুষের ভিড় থাকায় আমি রাস্তার অনেকটা ভেতর দিয়ে হাটছিলাম, আমার অবচেতন মন বলল তুমি পাশে যাও। আমি ভিড় ঠেলে ফুটপাতের দিকে যাচ্চি এমন সময় পেছনে টায়ার ব্লাস্ট হওয়ার বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি একটা বাস নিয়ন্ত্রন হারিয়ে একটা রিক্সাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছে, এতে রিক্সার একটা চাকা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। রিক্সা চালক লাফ দিয়ে দূরে সরে যাওয়ায় তার তেমন কিছুই হয় নি। শুধু রিক্সাটাই ভেঙ্গেছে আর তেমন কোন ক্ষয় ক্ষতি হয় নি।

আমি সামনে হাটতে সেদিন সেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে করছিলাম, আমি আগে থেকেই কিভাবে বুঝলাম এখানে একটা ঘটনা ঘটবে? আমার মনে হচ্ছিল ঠিক এই ঘটনাটা এখানে ঠিক এভাবে আমার সাথে আগেও ঘটেছে। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? হতে পারে ২ মাস বা ৬ মাস বা ৫ বছর আগে এখানে বা আমার চোখের সামনে ঠিক এমন একটা ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু কিভাবে এই ঘটনাটা আমি আগে থেকেই টের পেলাম?

এ সব চিন্তা করতে করতেই সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম। কিন্তু এমন ঘটনা এটাই আমার সাথে প্রথম আর একমাত্র নয়। এর আগেও আমার সাথে এমন ঘটেছে। হয়ত আমি ক্যাম্পাসে গিয়েছি, শান্ত ক্যাম্পাস। কিন্তু আমার মনে হতে লাগল আজ কিছু প্রচন্ড ঝামেলা হবে। আমি বাসায় ফিরে গেছি, দুপুর বেলা শুনি আসলেই হয়েছে। অথবা আমি রাস্তা দিয়ে হাটছি হঠাৎ মনে হল সামনে ঝামেলা আছে, আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। অমনি টুপ করে আমার সামনে একটা ফুলের টব উপর থেকে পোরে ভেঙ্গে গেল। মাথায় পরলে হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। অথবা ইংল্যান্ড ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সাথে খেলছে প্রথম ব্যাট করে ইংল্যান্ড ২৭০ করেছে। ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ব্যাট করতে নেমে ৩ উইকেটে ১৭। সবাই ইংল্যান্ডের জয় সেলিব্রাশান শুরু করে দিয়েছে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ইংল্যান্ড হারবে। ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ৪ ওভার বাকি রেখেই জিতে যাবে, হাতে তখনো ৪ টা উইকেট থাকবে। খেলা শেষে দেখলাম ঠিক তাই। এমন ঘটনা আমার সাথে প্রায়ই হয়, কিন্তু কেন হয় কিভাবে হয় আমার কোন ধারনা নেই। কবে থেকে এমনটা হচ্ছে সেটাও ঠিক বলতে পারব না।

আজও আফিস ছুটির পর সন্ধায় হেটে বাসায় যাচ্ছি আর বিভিন্ন চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একটু অন্যমনষ্ক। অর্ধেক পথ পার হয়েছি, এখানে রাস্তা, ফুটপথ কিছুটা ফাঁকা। আমি হাটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলাম। হঠাৎ রাস্তার পাশে চোখ পরতেই কেমন যেন লাগছে। কিছু একটা ঝামেলা আছে, কিছু একটা ঠিক মিলছে না। আমি ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারছি না। আমার মাথার ভেতর চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আমি পার্থক্যটা ধরার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। আরো কয়েক কদম হাটার পর ব্যাপারটা ধরতে পারলাম। রাস্তাটা একটু অন্য রকম লাগছে। আমি ভাবছি আমি কি ভুল করে অন্য কোন রাস্তায় চলে এসেছি? চারদিকটা ভাল ভাবে দেখতে লাগলাম। নাহ রাস্তা তো ঠিকই আছে কিন্তু চারপাশের দৃশ্যগুলোতে পরিবর্তন এসেছে।

কিছু নতুন বিল্ডিং পুরাতন লাগছে, শ্যাওলা ধরে গেছে, আবার আগের কিছু একতলা দোতলা বিল্ডিং এর জায়গায় নতুন বহুতল ভবন হয়েছে। কিছু নতুন গলি হয়েছে, রাস্তাটা একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার। আরেকটু সামনে আগাতে দেখলাম যেখানে একটা ঝোপঝাড় ছিল, মানুষ ময়লা ফেলত সেখানে একটা বাচ্চাদের পার্ক হয়েছে। এই সন্ধ্যা বেলাতেও কিছু বাচ্চা বাবা মায়ের সাথে সেখানে খেলছে, কেউ দোলনায় দোল খাচ্ছে। পাশের দোকান গুলির ডেকোরেশান ও অনেক আপডেট হয়েছে। আগে এই রাস্তায় হাটার সময় দুই একটা বি এম ডাব্লিউ আর মার্সিডিজ দেখা যেত রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা। এখন দেখছি রাস্তায় চলা আর পাশে পার্ক করে রাখা অর্ধেকের বেশী গাড়ি দামি ব্র্যান্ডের।

আমি সামনের দিকে হাটছি আর পরিবর্তন গুলি দেখছি। ভাবছি কি হচ্ছে কিভাবে হচ্ছে। আমার দৃষ্টি সামনের দিকে নেই বরং দুপাশের বিষয় গুলি দেখছি আর হাটছি। এমন সময় কারো সাথে ধাক্কা লাগল। ঠিক ধাক্কা নয় কেউ আমার সামনে থেকে দু কাধ ধরে থামিয়ে দিল। আমি সামনের দিকে তাকিলে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ঠিক যেন কত দিনের চেনা আমার বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে। চেহারাটা খুব চেনা লাগছে কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না। বয়সে আমার থেকে ৮/১০ বছরের বড় হবে। আমাকে জিজ্ঞেস করছে “হালো রাহাত ভাই কেমন আছন?” গলার স্বর টাও চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু চিনতে পারছি না। আমি স্বভাব সুলভ বললাম ভাল আছি। লোকটা দু ঠোট বিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে বলল এতক্ষন আপনি ভাল ছিলেন কিন্তু এখন ভাল নেই। তার গলার স্বরে কৌতুক খেলা করছে।

তিনি আবার বললেন আমাদের পৃথিবীতে আপনাকে স্বাগতম। আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। ওনার এই কথা শোনার পর আমি টের পেলাম আমার কেমন যেন একটু শিত শিত গালছে, আমার কপাল বেয়ে চিকন একটা ঘামের ধারা নেমে আসছে। অজানা একটা ভয় মনের মধ্যে জেকে বসেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনাদের পৃথিবী মানে? আর আপনি কে? আপনাকে তো আমি ঠিক চিনতে পারছি না। তিনি বললেন সব বলছি, তার আগে চলেন কোথাও বসি। আমি তার সাথে চুপচাপ হাটতে শুরু করলাম। লোকটা মুচকি হাসছে। আমার আবস্থা দেখে খুব যেন মজা পাচ্ছে।

আমরা কয়েক পা হেটে একটা রেষ্টুরেন্টে ঢুকলাম। এই রেষ্টুরেন্টটা আমার চেনা, মানে নাম এক, যায়গাটাও এক কিন্তু স্ট্রাকচার বদলে গিয়েছে, এই রেষ্টুরেন্টে আমি আগেও কয়েকবার এসেছি কিন্তু তখন এমন ছিল না। আমরা রুফ টপে গিয়ে বসলাম। ভদ্রলোক কথা শুরু করলেন, আমাদের পৃথিবী কেমন লাগছে? আমি বললাম ভাই আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

ভদ্রলোক হাসলেন, বললেন চারপাশ দেখেও কি কিছু বুঝতে পারছেন না? আমি বললাম একটু অন্যরকম, অন্যরকম ঠিক না মনে হচ্ছে অনেক দিন পর এই রাস্তায় এসেছি। অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু আমি তো প্রতিদিন এই রাস্তায় আসা যাওয়া করি। এমন টা তো হওয়ার কথা না।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকেও আমি ঠিক চিনতে পারছি না। কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগছে। ভদ্রলোক এবার খুব জোরে শব্দ করে হাসলেন। বললেন আমি আসিফ। আপনার পাশের চেয়ারে বসেই আমি কাজ করি। কিন্তু আপনার পৃথিবী তে নয় আমাদের এই পৃথিবীতে। আপনার পৃথিবীতে আমার মত আর একজন আসিফ আপনার পাশে বসেন।

আমি আবার বললাম হ্যাঁ আসিফ ভাইয়ের সাথে আপনার চেহারার অনেকটা মিল আছে, তাই বলে আপনার গাজাখোরি কথা আমি মানতে পারছি না। আর এই “আপনার পৃথিবী” “আমার পৃথিবি”, এগুলো কি?

এবার আসিফ দাবী করা ভদ্রলোক বললেন প্যারালাল আর্থ ব্যাপারটা সম্পর্কে শুনেছেন? আমি বললাম হ্যাঁ।

 

আসিফ ভাই- আপনি আর আমি হচ্ছি সেই দুই প্যারালাল আর্থ এর দুই বাসিন্দা।

আমি- তা কি করে সম্ভব? সেটা তো শুধু কল্প কাহিনীতেই সম্ভব। বাস্তবে সম্বব না।

আসিফ ভাই- বাস্তবেও সম্ভব, তা না হলে আপনি কোথায় এলেন?

আমি- ভাই একটু ক্লীয়ার করে বলেন তো

আসিফ ভাই- প্যারালাল আর্থ ব্যাপারটা হচ্ছে একই করম দেখতে দুইটা পৃথিবী যার সব কিছুই একই রকম দেখতে, যেখানে সবকিছুই একই রকম ঘটে।

আমি- ভাই আমি এসব জানি, কিন্তু এগুলো কি বিশ্বাস যোগ্য?

আসিফ ভাই- হা বিশ্বাস যোগ্য। আমাদের এই মহাকাশের সব কিছুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট যেমন দুইটা সূর্য, দুইটা পৃথিবী, দুইটা চাঁদ, দুইটা বুধ, দুইটা রাহাত, দুইটা আসিফ ইত্যাদি। পার্থক্য হচ্ছে আপনাদের পৃথিবী আর আমাদের পৃথিবী দুইটা আলাদা গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। আপনাদের পৃথিবীতে যতজন মানুষ আছে এখানেও ততজন, আপনাদের পৃথিবীতে যতটা দেশ, ভাষা এখানেও ততটা। কোন পার্থক্য নেই। ধরুন আপনাদের পৃথিবী আমাদের পৃথিবীর ছায়া অথবা আমাদের পৃথিবী আপনাদের পৃথিবীর ছায়া।

আমি- তাহলে তো সব কিছু একই রকম থাকার কথা, কিন্তু আমি তো এখানে কিছু পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি?

আসিফ ভাই- ও হ্যাঁ একটা পার্থক্য আছে, সেটা হচ্ছে আমাদের পৃথিবী আপনাদের পৃথিবী থেকে কয়েক বছর এগিয়ে।

আমি- বুঝলাম, কিন্তু আমি আপনাদের পৃথিবীতে এলাম কিভাবে?

আসিফ ভাই- এটা আমারিকান আর চাইনিজদের অবদান।

১৯৪৩ সালে আমারিকান নেভি আইনস্টাইনের Unified Field Theory নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট চালায়। কিন্তু এই এক্সপেরিমেণ্টে কিছু ভুল থাকা তারা ভুল করে টেলিপোর্টেশান আবিষ্কার করে ফেলে। যদিও তারা পুরোপুরি সফল হয় নি, কিন্তু তারা গোপনে গবেষনা চালিয়ে যায়। এর পর ২০২২ সালের দিকে এসে তারা পুরোপুরি সফল হয়। ২০২৫ সালের দিকে চায়নিজ হ্যাকাররা এই গবেষনার ফলাফল চুরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে। ২০২৭ সালের মধ্যে তারা খুব সহজ একটা বেশিন বানাতে সমর্থ হয় যেটা ব্যক্তি ক্ষেত্রে ব্যবহার যোগ্য। এই মেশিন ব্যবহার করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আসা যাওয়া যায় এমনকি অন্য গ্রহেও। তবে সেটা মাত্র একঘন্টার জন্য। ২৮ সালের মধ্যেই এই মেশিন সারা দুনিয়ায় সারা ফেলে দেয় এবং এর দাম খুবই কমে যায়। আমিও মজা করার জন্য আলী এক্সপ্রেস থেকে একটা মেশিন কিনে ফেলি।

কিছুদিন আগে আমি আপনাদের পৃথিবীতে গিয়েছিলাম। ভাবলাম আপনাকেও একবার আমাদের পৃথিবিতে নিয়ে আসি। যেই ভাবা সেই কাজ। হাহাহহা।

আমি- বুঝলাম কিন্তু এখন আমি ফিরব কি করে?

আসিফ ভাই- চিন্তা করবে না। এক ঘন্টা পর আপনি অটোমেটিক চলে যাবেন। হাতের ঘড়ি দেখে, ৫০ মিনিট হয়ে গেছে, আর কিছুক্ষন। চলুন বাইরে যাই।

আমরা বের হয়ে চলে এলাম খোলা রাস্তায়। আর মাত্র ২ মিনিট বাকি। আমি ভাবছি আচ্ছা এই পৃথিবীর রাহাতের সাথে তো দেখা হল না। রাহাতের সাথে দেখা হলে আগামী ১২/১৩ বছর পর আমার অবস্থা কেমন হবে একটা ধারনা পাওয়া যেত।

আমি- আসিফ ভাই আপনাদের রাহাতের সাথে দেখা হলে ভাল লাগত। ওর সাথে যগাযোগ করা কি সম্ভব?
আসিফ ভাই- ওর সাথে আপনার দেখা না হলেও অর সাথে কিন্তু আপনার একটা যোগাযোগ আছে শুরু থেকেই।
আমি- কিভাবে?

আসিফ ভাই- টেলিপ্যাথিক। আপনার মাঝে মাঝে মনে হয় না যে এ কাজটা আমি করে ফেলেছি, বা এই ঘটানাটা ঘটেছে এমন একটা ফিল হওয়া যা আগে হয় নি। বা কোন গুরুত্বপূর্ন ঘটনা আগে থেকেই টের পেয়ে যাওয়া?

আমি- হ্যাঁ এমন হয় তো, প্রায়ই হয়।

আসিফ ভাই- হ্যাঁ এখানের রাহাত যা করে, রাহাতের সাথে যা ঘটে তার একটা ছায়া বা প্রভাব আপনার উপর পরে। তাই আপনার মনে হয় হয়ত এমন ঘটনা আপনার সাথে আগেও ঘটেছে।

ওহ আপনার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, যান ভাল থাকবেন। আর হ্যাঁ এখানে আজ যা ঘটল তা কারো সাথে সেয়ার করবেন না যেন। কেউ আপনার কথা বিশ্বাস করবে না। উলটা পালটা ভাববে আপনাকে নিয়ে। হাহা হাহাহা

আসিফ ভাই পকেট থেকে মোবাইলের মত একটা ডিভাইস বের করলেন, সেটা টিক টিক করে শব্দ করছে। আসিফ ভাই বললেন আর ১০ সেকেন্ড।

১ টিকটিক, ২ টিক টিক, ৩ টিক টিক………………………………. শব্দটা আস্তে আস্তে বাড়ছে ৯ টিক টিক ১০ টিক টিক

হঠাৎ চোখে একটা আলোর ঝলকানি এসে পরল। চোখ মেলে ডান দিকে তাকাতে দেখলাম বালিশের পাশে মোবাইলে এলার্ম বাজছে। হাতে নিয়ে এলার্ম টা বন্ধ করে টাইম দেখলাম সকাল ৭ টা। ঘুমটা আজ একটু আগেই ভেঙেছে। ভাবলাম আরো আধ ঘন্টা গড়াগড়ি করে তারপর বিছানা ছাড়ব।

ক্রেডিটঃ খাঁজা বাবা

সৌরজগতের গ্রহগুলো গোল কেনো? অন্য কোনো আকার হয় না কেন?

আমরা দেখি, গ্রহ, উপগ্রহ ও নক্ষত্রদের আকৃতি হয় গোলাকার (spherical)। অবশ্য মেরু অঞ্চলের দিকে কিছুটা চাপা। দুটো বিষয়ই আমরা আলোচনায় রাখবো। আপনাকে এক খণ্ড পাথর দেওয়া হলে একে আপনি ইচ্ছে মতো কেটে যে কোন আকৃতি দিতে পারবেন- ঘনক, পিরামিড বা গোলক ইত্যাদি। নিজের মতো রেখে দিলে এটি আগের মতই থাকবে। গোলকাকার হয়ে যাবে না। কিন্তু ধরুন, ঐ পাথরটির বদলে আপনাকে পৃথিবীর সমান একটা বস্তু দেওয়া হল। একে কেটে কুটে কি আপনি পিরামিড বানাতে পারবেন?

পারবেন না। কারণ, এখন বস্তুটা যথেষ্ট ভারী। এর অভিকর্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী। বস্তুর আকার যত বড় হবে, এর অভিকর্ষও তত বড় হবে। পূর্বোক্ত পাথরখণ্ডটিরও অভিকর্ষ (Gravity) আছে। কিন্তু অতি নগণ্য, অকার্যকর। মনে করুন, আপনি পৃথিবীর বুকে খুব উঁচু একটা ভবন নির্মাণ করবেন। তাহলে, এর ভিত্তি হতে হবে যথেষ্ট মজবুত। তা না হলে এটা নিজের ভারে তথা পৃথিবীর অভিকর্ষের চাপে ধসে পড়বে। কোনো গ্রহ, উপগ্রহ বা নক্ষত্রে যদি অনেক উঁচু কোন স্থাপনা থাকতো, তবে তা অভিকর্ষের টানে গুঁড়িয়ে যেত। ভাবছেন, তাহলে বুর্জ খলিফার মত সুউচ্চ স্থাপনা টিকে আছে কিভাবে? হ্যাঁ, এর ফাউন্ডেশান বা ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত এবং উচ্চতা তত বেশি নয় যত হলে ধসে পড়ত।  পাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

একটু খেয়াল করুনঃ

গ্রহ যদি হতো ঘনকের মতো, তার অর্থ হতো এর কোণাগুলো অপেক্ষাকৃত উঁচু। যেহেতু গ্রহ, নক্ষত্রদের অভিকর্ষ খুব বেশি শক্তিশালী সে কারণে এ কোণাগুলো টিকে থাকতে পারে না, ধসে পড়ে। যে কোনো কিছুই মাথা চাড়া দিতে যাবে, অভিকর্ষ তাকে এক হাত দেখে নিবে। ফলে বস্তুটি চার পাশ থেকেই সমান হতে শুরু করবে।

এখন, সবকিছুই টান-প্রাপ্ত হয় কেন্দ্রের দিকে। ফলে, কেন্দ্রের চারপাশে ভর জড় হয়ে গোলকের (sphere) আকৃতি তৈরি হবে।যথেষ্ট শক্তিশালী ভিত্তি না থাকলে সব উঁচু নিচু স্থাপনা সমতল হয়ে যাবে। এ জন্যেই গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্ররা গোলকাকার। যেসব গ্রহাণুর অভিকর্ষ অপেক্ষাকৃত কম, তারা গোল হতে পারে না। হয় এবড়ো থেবড়ো। যেমন, ছবিতে দেখন ৪ ভেস্টা নামক গ্রহাণুর ছবি।

Vesta 4

গোলকাকার হবার জন্য সর্বনিম্ন ভর কত হতে হবে?

ব্যাপারটা আসলে শুধু ভরের উপরই নির্ভরশীল নয়। বস্তুটা কী দিয়ে তৈরি তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোন কোন বস্তুকে অন্য বস্তুর চেয়ে সহজে নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ভর (mass) কম হলেও চলবে। পাথুরে কোন বস্তুর ক্ষেত্রে গোলাকাকৃতি পাবার জন্য ব্যাস প্রয়োজন ৬০০ কিলোমিটার। কিন্তু বরফ নির্মিত বস্তু হলে ব্যাস ৪০০ কিলোমিটার হলেও যথেষ্ট।

যেমন উপরোক্ত গ্রহাণু  ৪ ভেস্টা হলো সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহাণু। এর আকার হল দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে যথাক্রমে ৫৭৮ ও ৪৫৮ কিলোমিটার। ১৮০৭ সালে হেনরিখ উইলহেম ওলবার্স।

মেরু অঞ্চলে চেপে যায় কেন?

আমরা জানি গ্রহ, উপগ্রহরা যেমন আমাদের পৃথিবীও মেরু অঞ্চলে একটু চাপা তথা কম ব্যাসার্ধ্য বিশিষ্ট। এর কারণ হল পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করে। আবর্তন বেগ দুই মেরু মাঝখান তথা বিষুব অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আর মেরুতে কম। ফলে,  ঘূর্ণনের কারণে বিষুব অঞ্চলের দিকে বস্তুটা একটু লম্বা হয়ে যায়।

সূত্রঃ

curious.astro.cornell.edu
spaceanswers.com
www.universetoday.com
ক্রেডিটঃ আব্দুল্লাহ আদিল মাহমুদ 

সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী

সেদিন তিতিলকে জিজ্ঞাসা করলাম, “পৃথিবীর চাঁদ ক”টি?”

ও আমার প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকোতে শুরু করে দিল। পাশেই বসেছিল ছোট বোন তিন্নি। দিদিকে মাথা চুলকোতে দেখে ও ফিক্‌ করে হেসে বললো, “এমা এটা জানিস না? পৃথিবীর চাঁদ তো একটা।” তিন্নির উত্তরটা ঠিক, আবার বেঠিকও বলা যায়। ঊর্ধ্বাকাশে পাঠানো মানুষের তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে ধরলে পৃথিবীর চাঁদের সংখ্যা এখন অনেক।

মহাকাশে যে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি রয়েছে তার কিছু লাগে গবেষণার কাজে, আর বাকিগুলি লাগে মানুষের নানা কাজে। পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, অনুসন্ধান প্রভৃতি নানা কাজে এদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মহাকাশে গিয়েও শান্তি নেই। শত্রুর দল ওঁত পেতে আছে সেখানেও। মাঝে মধ্যেই ওদের হাঙ্গামায় বেসামাল হয়ে পড়ে এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলি আর তখনই শুরু হয় গন্ডগোল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে সে এক লন্ডভন্ড কান্ড ঘটে।

আমাদের পৃথিবী ঘিরে আছে একটি চৌম্বকক্ষেত্র। এই চৌম্বকক্ষেত্র একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষেত্রের মধ্যে আবদ্ধ আছে যাকে বলা হয় চৌম্বকমণ্ডল (Magnetosphere)। এই চৌম্বকমণ্ডল আবার একটি সদা-পরিবর্তনশীল অঞ্চলের দ্বারা আবদ্ধ। এই অঞ্চলকে বলা হয় ম্যাগনিটোপজ (Magnetopause)। পৃথিবীর চৌম্বক-মেরু ও ভৌগলিক-মেরু এক নয়। চৌম্বক-মেরুরেখা ও ভৌগলিক-মেরুরেখা ছেদবিন্দুতে ১১·৫ ডিগ্রি কোণ উৎপন্ন করে। পৃথিবীর চৌম্বক-উত্তরমেরু ও দক্ষিণমেরু একই ব্যাসের দু”টি বিপরীত বিন্দু নয়। এছাড়াও এই মেরু দুটি সময়ের সাথে সাথে স্থান পরিবর্তন করে। দেখা গেছে, পৃথিবীর চৌম্বক-উত্তরমেরু প্রায় ১৭ ডিগ্রি ব্যাসার্ধের একটি বৃত্তে ভৌগলিক-উত্তরমেরুর চারপাশে প্রায় ৯৬০ বৎসরে একবার প্রদক্ষিণ করে।

ভূ-বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস যে, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল লোহা-নিকেল সমবায়ে গঠিত। পৃথিবীর এই স্তরকে বলা হয় “নিফে” (Nife) স্তর। কোনো কারণে এই নিফে স্তর যদি আবর্তিত হতে থাকে এবং পৃথিবীর মেরুরেখার সঙ্গে যদি কোনো সমান্তরাল চৌম্বকক্ষেত্র থাকে তবে পৃথিবীর নিরক্ষরেখার সঙ্গে সমান্তরাল বৃত্তাকার পথে বিদ্যুৎ স্রোত প্রবাহিত হতে থাকবে।

 

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন আদিমকাল থেকে পৃথিবীর উপাদানে খুব অল্প পরিমাণ চৌম্বকত্ব ছিল। আকস্মিক তাপের উদ্ভবে অথবা ওই ধরনের কোনো কারণে ওই ক্ষীণ চৌম্বকত্ব ধ্বংস হয়ে পৃথিবীর নিরক্ষরেখা অঞ্চলে চৌম্বক বল-রেখা সঞ্চালিত হয়ে বিদ্যুৎ-প্রবাহের সৃষ্টি করে। আবার অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন এই বিদ্যুৎ-স্রোত তাপ-তড়িৎ ক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত। সূর্যের তাপ পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে পড়ে না। ফলে ভূ-পৃষ্ঠের উপর তাপের পরিমাণ সর্বত্র সমান থাকে না। এরফলে তাপ-বৈষম্যের সৃষ্টি হয়, যা তাপ-তড়িৎ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। কেউ কেউ মনে করেন, ভৌগলিক-মেরু এবং চৌম্বক-মেরু খুব কাছাকাছি হওয়ায় পৃথিবীর আহ্নিকগতির সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের একটা সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। এই প্রসঙ্গে ১৯১৮ সালের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ওই সময় পৃথিবীর আবর্তন গতির হঠাৎ-ই পরিবর্তন হয়। সেই সময় দেখা যায় পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রেরও পরিবর্তন ঘটেছে।


পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে সূর্য থেকে নিঃসৃত তড়িতাবিষ্ট কণার সমবায়ে গঠিত সৌরবায়ু বা সৌরঝড়। এই সৌরবায়ুর প্রবাহে চৌম্বকমণ্ডল অস্থির হয়ে ওঠে। পৃথিবীর কাছাকাছি সৌরবায়ুর বেগ সেকেন্ডে ৪০০ কিলোমিটারের মতো হতে দেখা যায়। এই বায়ু সূর্য থেকে কখনো একটানা আসে আবার কখনো ঝলকে ঝলকে আসে।

পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে দু’টি তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বলয়। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্ব যথাক্রমে ৩২০০ কিলোমিটার ও ১৬০০০ কিলোমিটার। এছাড়াও প্রায় ১০০,০০০ কিলোমিটার দূরে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ও অন্তর্গ্রহ মহাকাশ অঞ্চলের সীমান্ত বরাবর আরও একটি বলয় আছে। এই বলয়গুলির মধ্যে প্রথমটি প্রোটন কণিকার দ্বারা গঠিত, যার শক্তির পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের মতো। এর প্রান্তভাগ কখনো কখনো পৃথিবীর ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে নেমে আসে। আর দ্বিতীয় বলয়টি প্রধানত ইলেকট্রন কণিকার দ্বারা গঠিত, যার শক্তির পরিমাণ প্রায় এক মিলিয়ন (দশ লক্ষ) ইলেকট্রন ভোল্ট। পৃথিবী ঘিরে ওঠা তেজষ্ক্রিয় বলয়গুলির কণিকার উৎস সূর্য। সূর্য থেকে বেরিয়ে এসে এগুলি পৃথিবীর চুম্বকরশ্মির বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। সৌরকলঙ্কের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়া কমার সাথে এই সৌরকণিকা-স্রোতের পরিমাণ বাড়ে কমে।


বিজ্ঞানীদের মতে সৌরঝড়ের সময় সূর্যের আবহমণ্ডল থেকে চৌম্বক শক্তি হঠাৎ করে ছিটকে বেরিয়ে আসে। সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসে অগুন্তি তড়িতাহিত সৌরকণা। শক্তিশালী কণাগুলি এক্স-রশ্মি এবং সৌরঝড়ে তৈরি হওয়া চৌম্বকক্ষেত্র তীব্র গতিতে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। পৃথিবীতে দেখা ঝড়গুলির তুলনায় এই ঝড় কয়েক লক্ষগুণ শক্তিশালী। তবে এই ঝড়ের আঘাতে প্রাণহানির আশঙ্কা তেমন থাকে না। পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডল বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার এই ঝড়ের আঘাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে।

তবে সূর্য থেকে ধেয়ে আসা এই ঝড় যে পৃথিবীতে কোনো বিপর্যয় ঘটায় না তা নয়। তড়িতাহিত সৌরকণা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের অনেক ভিতরে ঢুকে পড়লে তা আর বের হতে পারে না। এই কণাগুলি তখন দু’টি মেরুর মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। এর ফলে সৃষ্টি হয় মেরুজ্যোতি। প্রধানত পৃথিবীর দুই মেরুর কাছাকাছি জায়গায় এই জ্যোতি দেখতে পাওয়া যায়। আয়নোস্ফিয়ারে যেসব প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হল মেরুজ্যোতি। ১৯৩৮ সালের জানুয়ারি মাসে অত্যন্ত উজ্জ্বল মেরুজ্যোতি দেখা গিয়েছিল। এই মেরুজ্যোতি এতটাই উজ্জ্বল ছিলযে ক্রিমিয়া এবং আফ্রিকা থেকেও এদের দেখা গিয়েছিল। এই সময় সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তীব্র চৌম্বক ঝটিকার আবির্ভাব ঘটেছিল।

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের আকষ্মিক পরিবর্তন ঘটলে অনেক সময় কম্পাস সঠিক দিক নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়। এই ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় “চৌম্বক-ঝটিকা”। চৌম্বক-ঝটিকার প্রভাবে ধাতব জিনিস, বিশেষত ধাতব তারের উপরে তড়িৎ প্রবাহের উদ্ভব হয়। এই তড়িৎ প্রবাহ এলোমেলো ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ইত্যাদি মারফৎ বার্তা প্রেরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়। চৌম্বক-ঝটিকার সঙ্গে আয়নোস্ফিয়ারে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সৌরকণিকার আঘাতে আয়নোস্ফিয়ার অত্যন্ত গরম হয়ে ওঠে, ফলে এলোমেলো গতিসম্পন্ন আয়নিত মেঘের সৃষ্টি হয়।

পৃথিবীর চারপাশে যে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি ঘুরছে সেগুলি পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের বাইরে থাকে। তাই এদের উপর সৌরঝড়ের আঘাতটা খুব বেশি আসে। সময়ের আগেই কোনো কোনো উপগ্রহ ভেঙে পড়ে পৃথিবীর বুকে। ১৯৭৯ সালে এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৭৩ সালে উৎক্ষেপণ করা “স্কাইল্যাব”-এর নিজের কক্ষপথে থাকার কথা ছিল ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু সৌরঝড়ের আঘাতে উপগ্রহটি সময়ের আগে ১৯৭৯ সালে ভেঙে পড়ে ভারত মহাসাগরে এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়।

***********
তথ্য সূত্রঃ
১) মহাকাশের বুকে পৃথিবী, শঙ্কর চক্রবর্তী, বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।
২) জ্ঞান ও বিজ্ঞান ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪
৩) আয়নোস্ফিয়ারেরকথা, এফ· আই· চেস্তনভ্‌, অনুবাদঃ রবীন্দ্র মজুমদার, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি (প্রাইভেট) লিমিটেড, কলকাতা।
৪) মহাকাশের কথা, শঙ্কর চক্রবর্তী, বেস্ট বুক্‌স্‌, কলকাতা।
৫) Encyclopaedia Britanica, 15th Edition.
ক্রেডিটঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র

অনেকগুলি তারা নিয়ে গঠিত কালপুরুষ তারকামণ্ডল। এর সংস্কৃত নাম মৃগনক্ষত্র আর পাশ্চাত্য নাম ওরিয়ন (Orion)। এই তারকামণ্ডলের ১৩ টি তারা পৃথিবী থেকে খুব সহজে খালি চোখে দেখা যায়। তারাগুলি কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলে কালপুরুষ মণ্ডলে একটি পুরুষের আকৃতি লক্ষ করা যায়। এর দক্ষিণ বাহুতে যে দুটি তারা আছে তার পূর্বেরটির নাম আদ্রা (Betelgeuse)। তাম্রবর্ণের এই বিশাল তারাটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নানা বিস্ময়।

আদ্রা নক্ষত্রটি আমাদের কাছে নানা নামে পরিচিত। সংস্কৃতে একে অভিহিত করা হয়েছে ‘বাহু’ নামে (যেহেতু এই তারাটি কালপুরুষের একটি বাহুর উপর অবস্থিত)। ইরানে পার্সীদের কাছে এর পরিচয় ছিল ‘বেস্‌ন’ (Besn) নামে— যার অর্থ ‘বাহু’। ইউরোপে স্লোভেনদের (Sloven) কাছে এর নাম ছিল ‘বেটেল গেজা’ (Betel geza)। আরব দুনিয়ায় তারাটি তিনটি নামে পরিচিত ছিল—

  • আল ধিরা (Al Dhira), যার অর্থ ‘বাহু’।
  • আল মান্‌কির (Al Mankib), অর্থ ‘স্কন্ধ’।
  • আল ইয়দ আল ইয়ম্মা (Al Yad al Yamma), অর্থাৎ দক্ষিণহস্ত।

কপটিকদের কাছে আদ্রা পরিচিত ছিল ‘ক্লারিয়া’(Klaria) নামে, যার অর্থ বাহুবন্ধনী(armlet)। ইউফ্রেতিস নদীর তীরে যারা বাস করত তারা এই তারাটিকে ডাকত ‘গুলা’ (Gula) নামে।

পৃথিবী থেকে তারাটির দূরত্ব প্রায় 427 ± 92 আলোকবর্ষ (131 পারসেক)। এত দূরে থাকা সত্ত্বেও তারাটিকে কালপুরুষ মণ্ডলের অন্যান্য তারার তুলনায় যথেষ্ট বড়ো ও উজ্জ্বল দেখায়। তারাটি কত বড়ো হতে পারে? উত্তর শুনলে অবাক হতে হয় বইকি। বৈজ্ঞানিকরা হিসেব করে দেখেছেন যে 16 কোটি সূর্য এই তারার ভিতর অনায়াসে ঢুকে যাবে। আর যদি পৃথিবীকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে প্রায় 20800000 কোটি পৃথিবী এর ভিতর এঁটে যাবে। এই হিসেব থেকেই বোঝা যায় তারাটি কত বড়ো। আমরা খালি চোখে আকাশে যত তারা দেখতে পাই তাদের মধ্যে আদ্রাই সবচেয়ে বড়ো।

bigganmohabishwe01 (Small) এত বড়ো তারা হয়েও আদ্রা সূর্যের চেয়ে ঠান্ডা। সূর্যের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা যেখানে 5800 কেলভিন সেখানে আদ্রার পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা 3100 কেলভিনের কাছাকাছি। এমনটা হওয়ার কারণ কী? বৈজ্ঞানিকদের অনুমান আদ্রার হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ হয়ে গেছে, কেন্দ্রে এখন শুধু হিলিয়াম দহন চলছে। কম তাপমাত্রা আর বিশাল আকৃতির জন্য একে শীতল দানব তারা (cool supergiant star) বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের তারা মহাকাশে খুব কম দেখা যায়। বৃশ্চিক রাশিতে (constellation scorpio) এই ধরনের আরেকটি লাল বর্ণের তারা আছে। তার নাম জ্যেষ্ঠা (Antares)। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের ছায়াপথে প্রতি দশ লক্ষ তারার মধ্যে একটি এই ধরনের তারার সন্ধান মিলতে পারে।

 

অতি বৃহৎ তারা হওয়া সত্ত্বেও আদ্রার ভর তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সূর্যের ভরের 20 গুণও নয়। এমনটা হওয়ার কারণ তারাটি প্রতি বছর 2×1024 কিলোগ্রাম ভর (0.000001 সৌরভর পরিমাণ পদার্থ) বাইরে নিক্ষেপ করে চলেছে। এই হিসেব থেকে অনুমান করা যায় যে জীবনের মূল পর্যায়ে তারাটির বর্তমান ভরের দ্বিগুণ ভর ছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আদ্রার ব্যাস প্রায় 60%-এর মতো বাড়ে কমে। ফলে এর আকার-আয়তনেরও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।

আদ্রা নক্ষত্রকে ঘিরে আছে ধুলো ও গ্যাসের বলয়। একটা-দুটো নয়, অনেকগুলি। সবচেয়ে দূরের বলয়টি আছে নক্ষত্রটির কেন্দ্র থেকে 3.3 আলোকবর্ষ দূরে (1 আলোকবর্ষ= 950000 কোটি কিলোমিটার)। নক্ষত্রটির চারপাশে যে প্রধান ধূলিবলয়টি আছে তার ব্যাস বর্তমানে 0.3 আলোকবর্ষের মতো। এটা প্রতি সেকেন্ডে 10 কিলোমিটার বেগে প্রসারিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা আদ্রার বর্ণমণ্ডলে যে গ্যাস আর ধুলো আছে তা নাক্ষত্রিক বাতাসে তাড়িত হয়ে এই ধুলোর বলয়গুলি সৃষ্টি হয়েছে। নক্ষত্রটির বর্ণমণ্ডলও কম বিস্ময়কর নয়। এর প্রান্তবর্তী অঞ্চলে গ্যাসের উষ্ণতা 2600 কেলভিনের মতো। আবার তার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে 1500 কেলভিন উষ্ণতার অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ুস্রোত। এধরনের ঘটনা খুব কমই দেখা যায়।

আরেকটি বিস্ময়ের কথা বলব। সেটা হল এর আবহমণ্ডল। সূর্যের আবহমণ্ডলের তুলনায় এর আবহমণ্ডল অত্যন্ত হালকা। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন আদ্রার আবহমণ্ডলের ঘনত্ব সূর্যের আবহমণ্ডলের তুলনায় দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। প্রকান্ড তারা হয়েও আদ্রার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলি অবাক করার মতো, তাই নয়? তবে এই বিশাল তারাটির বর্ণমণ্ডলটি বিশাল। কত বড়ো হতে পারে? গণিতের হিসেবে না গিয়ে অন্যভাবে ধারণাটা দেবার চেষ্টা করছি। সূর্য ও আদ্রার মধ্যে যদি স্থান পরিবর্তন করা যায় অর্থাৎ আদ্রাকে যদি সূর্যের জায়গায় বসানো যায় তাহলে নক্ষত্রটির বর্ণমণ্ডলের সীমা নেপচুন এবং প্লুটোর কক্ষপথের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে যাবে। অর্থাৎ পৃথিবী আদ্রার পেটের ভিতর ঢুকে যাবে।

আদ্রা একটি বিষমতারা (variable star)। এর দীপ্তি বাড়ে কমে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এর প্রভার মান 0.2 থেকে 1.2 এর মধ্যে ওঠানামা করে। এর দুটি সঙ্গী তারা আছে। প্রথমটি 5 A.U. দূর থেকে এবং দ্বিতীয়টি 45 A.U. দূর থেকে আদ্রার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।

‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে’— এ কথা বিশ্ববাসীদের কাছে যেমন সত্য মহাবিশ্ববাসীদের কাছেও তেমন সত্য। আদ্রাও এগিয়ে চলেছে এই শেষ পরিণতির দিকে। আগেই বলেছি তারাটির কেন্দ্রে এখন চলছে হিলিয়াম দহন। এই দহন শেষ হলে এটি নিয়ন-অক্সিজেন শ্বেত বামনে (Ne-O white dwarf) রূপান্তরিত হবে। তখন এর আকার সঙ্কুচিত হতে হতে পৃথিবীর মতো হবে। এই সময় এর ঘনত্ব এবং ঔজ্জ্বল্য অবিশ্বাস্য রকম বেড়ে যাবে।

কয়েকটি পর্যায় পেরিয়ে আদ্রা নক্ষত্র সুপারনোভার দিকে এগোতে থাকবে। নক্ষত্রটির কেন্দ্রে এখন হিলিয়াম দহন চলছে। কেন্দ্রের তাপমাত্রা 60 কোটি কেলভিনে পৌঁছলে শুরু হবে কার্বন দহন এবং তৈরি হবে নিয়ন আর হিলিয়াম। এই পর্যায়টা চলবে 600 বছর ধরে। এরপরে তাপমাত্রা 120 কোটি কেলভিনে পৌঁছলে শুরু হবে নিয়ন দহন এবং তৈরি হবে ম্যাগনেসিয়াম ও অক্সিজেন। মাত্র এক বছর পরেই কেন্দ্রের তাপমাত্রা পৌঁছে যাবে 150 কোটি কেলভিনে। শুরু হবে অক্সিজেন দহন আর সেই সঙ্গে তৈরি হবে সিলিকন ও হিলিয়াম। ছয় মাস পরে কেন্দ্রের তাপমাত্রা যখন 270 কোটি কেলভিনে পৌঁছবে তখন সিলিকন পুড়ে তৈরি হবে নিকেল যা নিউট্রনাইজেশন (Neutronization) হয়ে লোহায় রূপান্তরিত হবে। ব্যাস দহন শেষ। কেন্দ্রে যত লোহা জমতে থাকবে অভিকর্ষ চাপ তত বাড়তে থাকবে। ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির ফলে নক্ষত্রটির কেন্দ্রের ঘনত্ব এক সময় প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে 3×109 গ্রামে পৌঁছে যাবে। নক্ষত্রটির এই অতি ঘন অবস্থাটা কেমন হবে তা সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি। লুডো খেলার ছক্কার আয়তনের সমপরিমাণ পদার্থ তুলে আমরা আমাদের হাতের তালুতে রাখতে পারব না। কারণ ঐটুকু পদার্থের ভর হবে তিন লক্ষ কিলোগ্রামের মতো। এবারে নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কী প্রচন্ড চাপ তৈরি হবে নক্ষত্রটির কেন্দ্রে। কেন্দ্রের ভর ও ব্যাস যথাক্রমে এক সৌরভরের বেশি ও তিন হাজার কিলোমিটার হলে প্রচন্ড অভিকর্ষীয় চাপে ঘটবে বিস্ফোরণ যা সুপারনোভা নামে পরিচিত। চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে গামা রশ্মি। বিজ্ঞানীদের মতে এটি হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর সুপারনোভা। বিস্ফোরণের ঠিক পর মুহূর্তে (এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে) তাপমাত্রা পৌঁছে যাবে 500 কেলভিনে। সেইসঙ্গে শেষ হবে আদ্রা নক্ষত্রের জীবনকাল। তবে সেটা হতে এখনও অনেক দেরি। আমরা কেউই দেখে যেতে পারব না। আশঙ্কা হয়, যে হারে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে তাতে সেইসময় মানুষের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে কিনা।
ক্রেডিটঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

পানির বোতলের কারুকার্যের নেপথ্যকাহিনি

কৃষ্ণনগরে কাকুর বাড়িতে পৌঁছতে বেলা প্রায় দশটা বাজল। গুড ফ্রাইডের ছুটি থাকায় কাকু , কাকিমা ছাড়াও খুড়তুতো দাদা পিকলু, গোপাবউদি ও ভাইঝি টুম্পা বাড়িতেই ছিল। পিকলুদা শিক্ষক, গোপাবউদি অধ্যাপিকা আর টুম্পা ছাত্রী। ছুটির দিন ছাড়া এই সময় ওরা কেউই বাড়িতে থাকে না। কাল ফোন করে আগাম জানিয়েছিলাম, তাই আয়োজনের খামতি ছিল না। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পরই হাত-মুখ ধুয়ে যেতে হল ডাইনিং হলে। বসল জম্পেশ প্রাতরাশের আসর। খাওয়ার সাথে চলল আড্ডা। কিছুক্ষণ সাদামাটা পারিবারিক কথাবার্তা চলার পরই হঠাৎ আলোচনা তীক্ষ্ণ বাঁক নিল টুম্পার একটা অদ্ভুত প্রশ্নের হাত ধরে। ব্যাপারটা বরং খুলেই বলি।

 

শেয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠার আগে একটা প্যাকেজড্ ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের বোতল কিনেছিলাম। পুরো জল শেষ না হওয়ায় বোতলটা ফেলা হয় নি। ডাইনিং টেবিলের একপ্রান্তে সেটা শোভা পাচ্ছিল। বোতলটা দেখিয়ে টুম্পা প্রশ্ন করল, “জল ফুরোলেই তো ওটা বাতিল হবে। তাহলে বোতলটার গায়ে এত নকশার বাহার কেন?”

পিকলুদা পনির পকোড়া চিবোতে চিবোতে বলল, “এটাও জানিস না ! দেখতে সুন্দর লাগবে বলেই গা-টায় কারুকার্য করা হয়েছে।”

 

গোপাবউদি পিকলুদার কথায় ঘোরতর সন্দেহ ব্যক্ত করল। ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ জিনিসকে দৃষ্টিনন্দন বানানো তো ভস্মে ঘি ঢালারই সামিল! গোপাবউদির ধারণা, সৌন্দর্যবৃদ্ধি নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই আছে অন্য কারণ।

 

ছেলে-বউমার বিতন্ডায় কাকিমা নিরপেক্ষ অবস্থান নিল। ঝানু কূটনীতিকদের স্টাইলে বলল, “দেখতে যে ভালো লাগছে সেটা ঠিক। তবে শুধু দেখার জন্যই এত কিছু করা হয়েছে বলে তো মনে হয় না।” কাকু কিছু বললেন না। শুধু মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, প্রকৃত কারণটা মোটেই ওঁর অজানা নয় ।

 

আমি কাকুকে প্রস্তাব দিলাম , “আসল কারণটা তুমিই খোলসা করে জানিয়ে দাও না!” প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে কাকু বললেন,”টেকনিক্যাল টার্ম বাদ দিয়ে বোঝানোর এলেম আমার একদমই নেই। সবাই ভিরমি খাবে মোমেন্ট অফ্‌ ইনার্শিয়া, রেডিয়াস অফ্‌ জ্যাইরেশন,নিউট্রাল অ্যাক্সিস্‌ এসব শুনলে! সহজ করে বরং তুই-ই বলে দে।” অগত্যা আমাকে মাঠে নামতেই হল। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বললাম, “টেকনিক্যাল কচকচি বাদ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করব আমরা। শুরু করব একটা প্রশ্ন দিয়ে। আচ্ছা,প্যাতপেতে জিনিসকে পোক্ত বানানোর কি কোনো সহজ রাস্তা আছে?”

 

সবাই নিরুত্তর। আমি আবার ভাষণ শুরু করলাম, “স্রেফ আকার পাল্টেই এটা করা সম্ভব। এর অনেক নজির ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ইস্পাতের পাতলা চাদর এত নমনীয় যে মাদুরের মতো গোল করে গুটিয়ে রাখা সম্ভব। অথচ সেই চাদর দিয়ে বানানো করোগেটেড শিট্‌ বা চলতি কথায় টিনের শিট্‌ এত মজবুত যে টিনের চালের ওপর গিয়ে চড়ে বসলেও তা দুমড়োয় না।”

 

এবার একটা মোক্ষম প্রশ্ন করল টুম্পা। জানতে চাইল, মূল উপাদান এক থাকা সত্ত্বেও আকারের সাথে মজবুতির এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে কারণটা কী। “খুবই বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন,” আমি টুম্পার প্রশ্নের তারিফ করে বললাম, “বক্রন বা বেন্ডিং ঠেকাতে সাদামাটা চেহারার তুলনায় ঢেউতোলা কিংবা খাঁজওলা আকার অনেক বেশি উপযুক্ত। মোদ্দা কথা হল,বস্তুর উপাদান এক জায়গায় না রেখে ছড়িয়ে দিতে পারলে বস্তুর বক্রন-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। টাটার ‘সুমো’ বা মাহিন্দ্রার ‘বোলেরো’ গাড়ির ছাদে লম্বালম্বি খাঁজ রাখা থাকে এই কারণেই। ভারী মালপত্র বইবার মতো পোক্ত করার জন্যই ইঞ্জিনিয়াররা বানিয়েছেন খাঁজযুক্ত ছাদ। সমতল ছাদ হলে ভয় থাকত মালের ভারে তুবড়ে যাবার।”

 

গোপাবউদি মন্তব্য করল,”এখন বুঝতে পারছি বড়ো সাইজের হাতা-খুন্তির হাতল লম্বার দিকে সাদামাটা হলেও আড়াআড়ি দিকে সমতল না হয়ে কেন কিছুটা গোল আকৃতির হয়।” টুম্পা বলল, “কাকুমণি, আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি। জল ফুরোলেই ফেলে দেওয়া হবে বলে জলের বোতলের দেওয়াল মোটা বানিয়ে দাম বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। খাঁজটাজগুলো দেওয়া হয় পাতলা ন্যাতপেতে বোতলকে পোক্ত বানানোর জন্যই। ওগুলো না রাখলে সামান্য চাপেই বোতল দুমড়ে গিয়ে অসুবিধে ঘটাত।”

 

আমি হেসে বললাম, “কথাটা একশো শতাংশ ঠিক।” হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই কাকিমা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “এগারোটা তো বাজতে চলল! বউমা, এখুনি রান্নাঘরে চলো। অনেক কাজ পড়ে আছে।” অত:পর আমাদের জমাটি আড্ডার আসর ভঙ্গ হল।

ক্রেডিটঃ সুজিতকুমার নাহা

ছদ্মবেশী ফল

সুজিত ও আমার দিন ভালোই কাটছে। খরচাপাতি এখানে বেশি হলেও দু’জন একসাথে থাকি বলে সাশ্রয় হয় অনেকটাই, আছে যানজটের সমস্যা। তবে অফিস আমাদের আস্তানার কাছে হওয়ার দরুন যাতায়াতে কোনো অসুবিধে হয় না। ছুটির দিনগুলোও পরমানন্দে কাটে দর্জিলদার সাথে আড্ডা দিয়ে আর ঘুরে বেড়িয়ে।

 

নিরামিষ পদ বানানোর ব্যাপারে আমরা একস্‌পেরিমেন্ট চালাই মাঝেসাঝে। ডাল, আলুভাজা, ঘুগনি এসব সহজ রান্না রপ্ত করার পর মনে হল, এবার কিঞ্চিৎ জটিল কেস হাতে নেওয়া যেতে পারে। পটল, ঝিঙে, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো,বিন, কুমড়ো এসব দিয়ে মিক্সড ভেজিটেবলের তরকারি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল এক শনিবার। লুচির অবাঙালি সংস্করণ ‘পুরি’ দোকান থেকে কিনে নিলেই চলবে। সবজিগুলো জোগাড় করে মিশ্র সবজির পদ কীভাবে রান্না করা যায় তা নিয়ে যখন গভীর গবেষণা চলছে, তখনই হাজির হল দর্জিলদা। সবজিগুলোকে একঝলক দেখে গম্ভীর হয়ে বলল, “আজ তাহলে ফলাহার করাই ঠিক হয়েছে। তা বেশ! ফল খাওয়া খুবই ভালো অভ্যেস।”

 

আমি ও সুজিত মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। সবজিকে কেন ফল বলে ভুল করছে দর্জিলদা! মাথা-টাথা হঠাৎ খারাপ হল নাকি? আমাদের মনোভাব বুঝতে চৌকশ দর্জিলদার দেরি হল না। বলল, “ভাবছিস ভুল বকছি! ও কে, বিচার করে দেখা যাক কে ঠিক আর কে বেঠিক। সুজিত, অভিধানটা বার কর।” কবিতা লেখার অভ্যাস থাকায় সুজিতের কাছে যে হরবখত থাকে চলন্তিকা আর সমার্থশব্দকোষ, সেটা জানত দর্জিলদা। ড্রয়ার থেকে চলন্তিকা বের করে দর্জিলদাকে দিল সুজিত। অভিধান ঘেঁটে দু’টি পৃষ্ঠা চিহ্নিত করে ওটা আমার হাতে দিয়ে দর্জিলদা বলল, “ফল আর সবজির ফারাক কী তা নিজের চোখেই দেখে নে।”

 

চিহ্নিত স্থানে চোখ বুলিয়ে যা জানা গেল তা এইরকম :
ফল – বৃক্ষলতাদির শস্য বা বীজাধার ,
সবজি – শাক, আনাজ,তরকারি

 

আমি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষে বলেই ফেললাম, “সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে! পুজো-আচ্চায় লাগে, অসুখ হলে বেশি করে খেতে হয়, স্বাদে মোটামুটিভাবে মিষ্টি, রান্না না করে সরাসরি খাওয়া চলে এমন জিনিসকে ফল আর শাকপাতা, আনাজপাতি যা লাগে নিরামিষ তরকারি বানাতে তাকেই সবজি বলে জানতাম। এখন তো মনে হচ্ছে সবজিদের দলে ছদ্মবেশী ফলের ভিড়ই বেশি!”

 

আমার অকপট স্বীকারোক্তিতে দর্জিলদা বেজায় খুশি হয়ে বলল,“কথাটা কিন্তু বেড়ে বলেছিস! আসলে রন্ধন-সম্পর্কিত বিবেচনায় যেগুলো সবজি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত,সেগুলোর বেশির ভাগই উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে নির্ভেজাল ফল বই আর কিছু নয় ! স্রেফ মজা করার জন্যই ঝিঙে পটল এসব দিয়ে বানানো খাবারকে ‘ফলাহার’ বলে তোদের ভড়কে দিয়েছিলাম। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও বটানির বিচারে পটল, ঝিঙে, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো,বিন, কুমড়ো গোছের জিনিসকে মোটেই সবজি বলা চলে না , কেননা সবই গাছের ফল।”

 

“সবজিরূপী ফলের ব্যাপারটা দারুণ গোলমেলে ঠেকছে! বিজ্ঞানমতে কোন্‌টা সবজি আর কোন্‌টা ফল সেটা চটজলদি বুঝব কীভাবে দর্জিলদা ?” জানতে চাইল সুজিত।

 

“ঠিক আছে,বলছি,” দর্জিলদা ব্যাখ্যান শুরু করল,“উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিচারে ফল ও সবজির ফারাক দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। সহজ কথায়, বীজের থাকা বা না থাকার ওপরেই ফলত্ব বা সবজিত্ব নির্ভর করে। ব্যাপারটা খোলসা করে বলি। সপুষ্পক উদ্ভিদের বীজ ধারণকারী অংশকেই ফল বলা হয়। এই মাপকাঠিতে বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো, কুমড়ো এসবকে ফল বলে মানতেই হবে। কেননা এদের ভেতর বীজ আছে যা থেকে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে চারা বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের গাছ উৎপন্ন করা যায়। এখানে বলে রাখি, জেনেটিক কারিকুরি করে বীজহীন আঙুর বা কমলার মতো সিডলেস ফ্রুট সৃষ্টি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বীজ না থাকলেও এগুলোকে কিন্তু ফল বলেই গণ্য করতে হবে।

 

এবার আসা যাক সবজির কথায়। ফল বাদে গাছের এডিবল অর্থাৎ ভক্ষণীয় অন্য অংশই সবজি। সেই এডিবল পার্টটা পাতা,শেকড়,কাণ্ড এমনকী ফুল বা কুঁড়িও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলি,পালং বা লেটুস হচ্ছে গাছের পাতা, মুলো বা গাজর হচ্ছে গাছের মূল আর ফুলকপি কিংবা ব্রকোলি হচ্ছে গাছের কুঁড়ি। ডাঁটাশাক, পুঁই এসবের পাতা ও কাণ্ড দুই-ই খাওয়া যায়। ভক্ষ্য ফুলের দৃষ্টান্ত এই মুহূর্তে যা মনে আসছে তা হচ্ছে সজনেফুল আর বকফুল।”

 

আমি এবার দর্জিলদার দিকে একটা কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়লাম, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু বীজযুক্ত কাঁচালঙ্কা, সজনেডাঁটা বা মটরশুটিকে ফলপট্টিতে না রেখে কেন সবজিবাজারে রাখা হয়,সেটা তো মাথায় ঢুকছে না।” সহজেই গোলমেলে প্রশ্নটার মোকাবিলা করল দর্জিলদা। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে চটজলদি উত্তর দিল,“সাধারণ জনগণ বটানি জানে না। তাই স্বাদ আর ব্যবহারের ধরণ বিচার করেই আমজনতা উদ্ভিজ্জ জিনিসে ফল কিংবা সবজির লেবেল সেঁটেছে। সেইমত ওগুলোর ঠাঁই হয়েছে ফলপট্টি অথবা সবজিবাজারে।!”

 

“জ্ঞানলাভ তো অনেক হল, এখন দরকার এনার্জি লাভের। বেজায় খিদে পেয়েছে। চলো বাইরে থেকে কিছু খেয়ে আসি।” প্রস্তাব দিল সুজিত। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হতে বিলম্ব হল না। অত:পর আমাদের জ্ঞানগর্ভ আড্ডার আসর সমাপ্ত হল।

 

ক্রেডিটঃ জুনায়েদ আহমেদ সজিব

টেলিপ্যাথি কি? টেলিপ্যাথি কি সম্ভব?

টেলিপ্যাথির সহজ উত্তর হল ব্রেইন টু ব্রেইন ডাটা ট্রান্সফার। যেমনটা আমরা শেয়ার ইট এর মাধ্যমে করে থাকি। আপনারা যদি হলিউড এক্স ম্যান সিরিজের মুভিগুলা দেখে থাকেন তাহলে সেখানে প্রফেসর এক্স নামে একজনকে দেখবেন অন্য মানুষের মনের নিয়ন্ত্রন নিতে। মনের নিয়ন্ত্রণ নেয়াই টেলিপ্যাথি নয়। এটা টেলিপ্যাথির সামান্য একটা অংশ।

 

আনইউজুয়াল টেলিপ্যাথি প্রমানঃ ইচ্ছাকৃত টেলিপ্যাথির প্রমান আজ পর্যন্ত মেলেনি। ওটা প্রফেসর এক্স আর এক্স ম্যান সিরিজেই সীমাবদ্ধ। এই পর্যন্ত প্রায় কয়েক হাজারের উপর মানুষ আরেকজনের মনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে বলে দাবি করেছেন।যদিও সরাসরি পরীক্ষায় কেউই পারেননি। কিন্তু দুই একটা উদাহরণ তবুও চমক লাগিয়ে দেয়।

 

সেপ্টেম্বর ৯,১৯৪৮ সালে মূলতান দখলের সময় সেখানকার ইনচার্জ সেনাপতি মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি মারা যাবেন জেনে তার হাতের রিংটা তিনি পাশের সেনাদের তার বউয়ের হাতে পৌছে দিতে বলেন। ঠিক তার ১৫০ কিলোমিটার দূরে ফিরোজপুরে তার বউ ঠিক ওইসময় একদম একই বিষয় স্বপ্নে দেখেন! তিনি স্বপ্নে দেখেন তার স্বামী বলছেন – “এই রিংটা নিয়ে যাও আর আমার বউকে দিয়ে দিও।” পরবর্তীতে এই কেস এসপি আর ভেরিফাই করে সত্যতা প্রমান পায়।

 

টুইন টেলিপ্যাথি প্রমানঃ বলা হয়ে থাকে দুটো যমজ বাচ্চাকে জন্মের পর থেকে যদি আলাদা করে দুইটা ভিন্ন দেশেও রাখা হয় তাহলে তাদের আচরণে অদ্ভুত কিছু মিল পাওয়া যায়। আপনি আবার ভরুন ধাওয়ানের জুডুয়া টু ফিল্মে যাইয়েননা। আমেরিকার জেমস আর্থার স্প্রিঙ্গার আর জেমস এডওয়ার্ড লুইস যমজ ছিলেন। জন্মের পরেই লুইসকে তার খালা ভিন্ন দেশে নিয়ে যান। ওদের কারো সাথে কারো বিন্দুমাত্র যোগাযোগ ছিলোনা। কিন্তু মারাত্মক কিছু অদ্ভুত আচরণ তাদের মধ্য প্রকাশ পায়। দুই পরিবারই তাদের নাম সংক্ষেপে জিম রাখে। দুইজনের সাথে কোন যোগাযোগ না থাকলেও তারা উভয়ই ‘ল’  ইনফোর্সমেন্ট ট্রেইনিং করে, দুজনেই চিত্রাঙ্কনে খুব ভাল ছিল, দুজনেই লিন্ডা নামের দুই মেয়েকে বিয়ে করেন, দুজনেই তাদের সন্তানের নাম রাখেন এলান, তারা দুইজনই তাদের বউদের ডিভোর্স দেন এবং পরবর্তীতে বেটি নামে অন্য দুজনকে বিয়ে করেন, দুজনেরই কুকুরের নাম টয় রাখেন। তারপর ৩৯ বছর পর ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ তে তারা প্রথমবারের মত নিজেদের কথা জানতে পারেন এবং দেখা করেন! হোয়াদ্দাপাক ওয়াজ দ্যাট!

কোয়ান্টাম সাইন্সে টেলিপ্যাথি পসিবল। বিজ্ঞান অলরেডি ব্রেইন টু ব্রেইন মেসেজ পাঠাইছে তাও ইন্ডিয়া থেকে ফ্রান্সে সেপ্টেম্বর ২০১৪ তে। হার্ভার্ড ইউনির গবেষকরা বিশ্বাস করেন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরেও ব্রেইন মেসেজ পাঠানো সম্ভব! কিন্তু ইন্ডিয়া টু ফ্রান্সে মাত্র দুইটা শব্দ পাঠানো হইছিলো তাও ৯০ সেকেন্ড লাগছে।

 

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের হিসেব অনেক জটিল তাই বাকিটা আর লিখলাম না। যাইহোক অদূর ভবিষ্যৎ এ টেলিপ্যাথি পূর্ন রুপ পেলে আমরা উপকারী আর অপকারী দুটা দিকই পাবো।

 

লিখেছেনঃ Yeasin Raihan

মস্তিষ্কের কত অংশ মানুষ ব্যবহার করে?

মানুষ তার মস্তিস্কের কত অংশ ব্যাবহার করে? যদি শতভাগ ব্যাবহার করতো তাহলে কি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারতো?

 

১) লুসি মুভিটা অনেকেই দেখছেন। স্কারলেট জোহানসন তার ব্রেইনের ১০০% ব্যাবহার করে কিভাবে ভ্যানিশড হয়ে গিয়েছিলো! এইরকম কল্পকাহিনী আমি কিছুকাল আগেও বিশ্বাস করতাম। আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হল মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০% ব্যবহার করে এই উক্তিটায় বিশ্বাস করা। আরো একটা ধারনা আমাদের ভুল। আমরা ভাবি হয়ত ১০০% ব্যাবহার করতে পারলে ৩ পেজের একটা সমাধান সেকেন্ডের মাথায়ই করে ফেলতে পারবো!

২) ব্রেইনের মাত্র ১০% ক্ষমতা মানুষ ব্যবহার করে এই মিথ আসলে ঊনবিংশ শতকের কয়েকজন সায়েন্টিস্ট এর। তারপর এটি প্রমান ছাড়াই অনেকগুলা সায়েন্স-ফিকশন মুভিতে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে যার আদৌ কোন ভিত্তি নেই। অনেকে আরো একধাপ এগিয়ে মনে করতেন আইনস্টাইন তার ব্রেইনের মাত্র ১৩% ইউজ করতেন অর্থাৎ সাধারনের চেয়ে ৩% বেশি। আর এ দিয়েই তিনি বিশাল কিছু আবিস্কার করেছেন! থামেন ভাই। কোন যন্ত্র দিয়ে তখন মাপছে যে আইনস্টাইন ১৩% ইউজ করতো?

৩) আসলে আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে ১০% থাকে নিউরন কোষ আর বাকি ৯০% থাকে গ্লাইয়াল কোষ পুরা মস্তিষ্ক)। নিউরন প্রসেসিং আর ট্রান্সমিশন এ সাহায্য করে। অন্যদিকে বাকি ৯০% এই ১০% এর কাজে সহযোগিতা করে। এই ১০% মিথটা আসলে এই জায়গা থেকেই আসছে। আমরা অলরেডি জেনে গেছি আমরা আমাদের শতভাগ ব্রেইনই ব্যবহার করি। আর ব্রেইন শুধুই একটা কাজ করেনা। কয়েকশো কাজ প্রতিনিয়ত বডিতে করতে থাকে।

৪) ব্রেইন শরীরের মাত্র ৩% ভর নিয়ে গঠিত কিন্তু কাজের সময় শক্তি খরচ করে মোট শক্তির ২০-২৫% পর্যন্ত! মস্তিষ্ক যদি শুধুমাত্র একসময় একটা কাজের সমাধান করতো তাহলে বডির বাকি অংশ হাইবারনেটেড থাকতো আর ওই একটা অংশে এতবেশি ব্লাড সার্কুলেশন হত যে ওই রক্তচাপে আমরা মারা যেতাম।

৫) একদম সহজ ভাষায় বুঝেন। মনে করুন আপনি একটা ভিডিও দেখছেন। আর ভিডিও দেখার সাথে সাথে আপনার শ্বাস নিতে হচ্ছে, রক্ত চলাচল করছে সারা শরীরে, খাদ্য ডাইজেস্ট হচ্ছে, আপনার চোখকে ভিডিও দেখতে সাহায্য করতে হচ্ছে। ১০% নিউরন শুধু ভিডিও দেখার কাজ করে। বাকি ৯০% ই এই যাবতীয় সবকাজে ব্যাস্ত থাকে।

৬) তাহলে আমিও ব্রেইনের ১০০% ইউজ করি, নিউটনও করতেন। কেমনে কি?

 

ওয়েল। আপনি ব্রেইনের ১০০% ইউজ করেন। আপনার ক্লাসের বেস্ট ছাত্রীটাও ১০০% ইউজ করে। সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটাও ১০০% ইউজ করে। কথা হল এই ১০০% এর মধ্য যে বেশি ইউটিলাইজ করবে সেই ভালো। বুঝেননি? ধরেন মুস্তাফিজুর রহমান আর তামিম ইকবাল দুইপ্রান্তে ব্যাটিং করছেন। আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কে ভাল ব্যাটিং করে? আপনি বলবেন তামিম ইকবাল। কেন? সিম্পল, কারন দুইজনই মানুষ কিন্তু দুইজন দুইভাবে বলগুলাকে ইউটিলাইজ করতে জানে।

 

লিখেছেনঃ Yeasin Raihan